ক্ষমতায় বসার ৯ মাস না হতেই বড় ধরনের আন্দোলনের মুখোমুখি হয়েছে সরকার। ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করাসহ বিভিন্ন দাবি আদায়ে রাজপথে নেমে এসেছেন পোশাক শ্রমিকরা। গত কয়েকদিন ধরে চলমান এই আন্দোলনে অস্থির হয়ে উঠেছে রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশ। আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খেতে হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে।
সবশেষ সোমবারও (২ নভেম্বর) রাজধানী ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেছে পোশাক শ্রমিকরা। গত কয়েকদিনের ধারাবাহিকতায় এদিনও বিক্ষোভকালে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। যানবাহন ভাঙচুর, পুলিশের গাড়িসহ বিভিন্ন পরিবহনে আগুনের ঘটনাও ঘটেছে বেশ কয়েক জায়গায়।
সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হলেও আন্দোলন থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না এখনও। ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় কয়েক শতাধিক পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে এ অবস্থায়। মামলা ও ধরপাকড়ের ঘটনাও ঘটছে ব্যাপকভাবে। সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, বিক্ষোভে ঢুকে পড়েছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা; সেইসঙ্গে বিক্ষোভে উসকানি দিচ্ছে বিরোধীদল।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সোমবার সচিবালয়ে পোশাক মালিক ও শ্রমিকদের সাথে আলাদা বৈঠক করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীসহ সরকারের কর্তা ব্যক্তিরা।
পোশাক শ্রমিকদের মজুরি নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্তের আশ্বাস স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আশ্বাস দিয়েছেন, পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে গঠিত মজুরি বোর্ড দ্রুতই কাজ শুরু করবে। তার ভাষ্য, শ্রমিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। গতকাল (রোববার) সকালে বোর্ড গঠন করা হয়েছে। আজই বোর্ডের প্রথম বৈঠক হতে পারতো, না হলেও খুব শিগগির বৈঠক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এর আগে, রোববার (১ নভেম্বর) ন্যূনতম মজুরির দাবিতে পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনের মধ্যে রোববারই মজুরি বোর্ড গঠন করে সরকার। এদিন রাতেই সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মন্ত্রীদের সাথে জরুরি বৈঠক করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের নির্দেশনা দেন।
বিক্ষোভ থেকে সরে এসে সরকাপ্রধান শ্রমিকদেরকে কাজে ফেরার আহ্বান জানানোর পরও কোনোরকম স্বাভাবিক হয়নি পরিস্থিতি। বরং রোববারের মতো সোমবারও বিক্ষোভ ছড়িয়েছে বিভিন্ন স্থানে। তাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আশ্বাসের পর এবার শ্রমিকরা শান্ত হবেন কি না, তা নিয়ে রয়ে গেছে প্রশ্ন।
সোমবার সারাদিন যেমন ছিল আন্দোলনের পরিস্থিতি
রোববারের বিক্ষোভের জের ধরে সোমবার সকাল থেকেই ঢাকার মিরপুর এলাকার বিভিন্ন পয়েন্টে পুলিশের কড়া অবস্থান দেখা যায় সকাল থেকেই। মিরপুর ১০, পল্লবী, কাফরুলসহ বিভিন্ন জায়গায় ছোট ছোট দলে জড়ো হয়ে বিক্ষোভের প্রস্তুতিও নিতে দেখা যায় পোশাক শ্রমিকদের অনেককেই।
সকাল সোয়া ৯টার দিকে শ্রমিকরা মিরপুর-১০ এলাকায় সড়কে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় পুলিশ ও শ্রমিকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা-ধাওয়া শুরু হয়। শ্রমিকরা রাস্তায় নামার চেষ্টা করলে তাদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ারশেল ছুঁড়ে পুলিশ। এই বিক্ষোভ চলাকালে কয়েকজন বিক্ষোভকারীসহ বেশ কয়েকজনকে সেখান থেকে আটকও করা হয়।
সকাল সোয়া ৯টার দিকে মিরপুর ১১ ও ১২ এলাকায় পোশাক শ্রমিকরা রাস্তায় জড়ো হলে পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। পোশাক শ্রমিকদের এই আন্দোলনের প্রতিবাদে মিরপুরের রাস্তায় মিছিল করতে দেখা যায় ক্ষমতাসীন বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের।
ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার মহিদুল ইসলাম এ সময় জানান, রোববার মিরপুরের বিক্ষোভ ঘিরে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও আগুনের ঘটনায় এখন পর্যন্ত পাঁচটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব ঘটনায় সোমবার পর্যন্ত অন্তত ২৯জনকে আটক করা হয়েছে।
এদিন ঢাকার বাইরে গাজীপুরে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে সকাল থেকে বিক্ষোভ করেন পোশাক শ্রমিকরা। বিক্ষোভ দমনে পুলিশের পাশাপাশি বিজিবিও মোতায়েন করা হয় গাজীপুরে।
এ সময় শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বেশ কয়েকটি সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে সকাল থেকে কয়েক ঘণ্টার জন্য যানবাহনও বন্ধ হয়ে যায়।
বিকেলে গাজীপুর শিল্প পুলিশের সুপার আমজাদ হোসেন বলেছেন, সকাল থেকে বিক্ষোভ চললেও বিকেল নাগাদ পরিস্থিতি স্বাভাবকি হয়েছে।
পোশাক শ্রমিকদের এই বিক্ষোভ ছড়িয়েছে ঢাকার পার্শ্ববর্তী নারায়ণগঞ্জেও। সোমবার দুপুরে পোশাক শ্রমিকরা রাস্তায় বেরিয়ে এসে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডে শিবু মার্কেট এলাকায় সড়কে অবস্থান নেয়। ফলে ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে ব্যাপক দুর্ভোগ তৈরি হয়। প্রায় চার ঘণ্টা অবরোধের পর পুলিশ শ্রমিকদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দিলে যান চলাচল শুরু হয়।
এদিন আশুলিয়ায় শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন। এ সময় একটি কাভার্ড ভ্যানে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।
বিভিন্ন কারখানায় ছুটি, আটক অনেকে
ঢাকার মিরপুর-১১ এলাকায় পাশাপাশি কয়েকটি পোশাক কারাখানা। সকাল তখন সাড়ে নয়টা। প্রতিটি কারখানার মুলগেটে তালা। কারখানার বাইরে ছুটির নোটিশ টানিয়ে লেখা হয়েছে, ‘আজ দোসরা নভেম্বর ২০২৬ তারিখে অনিবার্য কারণবশত ফ্যাক্টরি ছুটি ঘোষণা করা হলো’।
এমন কয়েকটি কারখানার গেটে যারা দায়িত্ব পালন করছিলেন তাদের কয়েকজনের সাথে কথা হয়। তারা জানান, রোববারের সহিংসতার পর সোমবার কারখানায় ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।
মিরপুর এলাকায় এসব কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হলেও কয়েকটি কারখানার আশপাশে শ্রমিকদের সকালের শুরুতে জড়ো হতে দেখা যায়। যদিও পুলিশের টহল ও ক্ষমতাসীন বিএনপি-অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের রাস্তায় প্রতিবাদ ও মিছিলের কারণে পরে তাদের অনেককে ছত্রভঙ্গ হয়ে যেতে দেখা যায়।
মিরপুর-পল্লবী কাফরুল এলাকার অনেক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হলেও কল্যাণপুর এলাকার কয়েকটি পোশাক কারখানা চালু অবস্থায় দেখা যায়। সেখানে অনেকটাই স্বাভাবিক পরিস্থিতি বিরাজ করছিল।
সকাল থেকে মিরপুর এলাকার বিভিন্ন রাস্তায় পুলিশকে বেশ তৎপর দেখা যায়। এসময় মিরপুর ১০ গোলচত্ত্বরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার মহিদুল ইসলাম এসময় সাংবাদিকদের জানান, পোশাক কারখানায় যারা অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করছে তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হবে। তিনি জানান, রোবরার রাত থেকে সোমবার পর্যন্ত অন্তত ২৯ জনকে আটক করেছেন তারা।
পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে গাজীপুর অঞ্চলেও দেড়শোর মতো গ্যাঁট কারখানা সোমবার ছুটি দেওয়া হয়েছে।
সচিবালয়ে কয়েক দফায় বৈঠক
রোববার রাতে প্রধানমন্ত্রীর সাথে জরুরি বৈঠকের পর সোমবার সকালে সচিবালয়ে পোশাক কারখানা মালিকদের সাথে বৈঠক করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীr সালাহউদ্দিন আহমদ, আরিফুল হক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিনসহ আরো কয়েকজন।
বৈঠক শেষে ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, যেসব শিল্প মালিকদের রাজনৈতিক পরিচয় ছিল, যারা নিষিদ্ধ সংগঠনের হয়তো কোন কোন সময় কেউ এমপি বা কেউ মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী ছিল সেসমস্ত শিল্প মালিকরা তারা এ সমস্ত অস্থিরতার পেছনে কাজ করছে বলে আমাদের কাছে তথ্য আছে এবং সেটার প্রমাণও আছে।
ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের জন্য বোর্ড গঠনের আলোচনার মধ্যে এমন অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা যারা করছে তাদের পেছনে যারা ইন্ধন দিচ্ছেন তারা চিহ্নিত হয়েছে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান, যারা শ্রমিক আন্দোলনের নামে স্বার্থবিরোধী কাজে লিপ্ত, দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির কাজে লিপ্ত তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
মালিকদের সাথে বৈঠকের পর এরপর দুপুরে আবারো সরকারের এই প্রতিনিধি দল বৈঠক করেন বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের সাথে। বৈঠক শেষে শ্রমিক সংগঠনের পক্ষ থেকে ব্রিফিং করেন শ্রমিক নেতা ও মজুরি বোর্ডের সদস্য বাবুল আখতার।
সেখানে বাবুল আখতার দাবি করেন, শ্রমিক নামধারী অনেকে বিভিন্ন কারখানায় গিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করছে। তাদের ইন্ধনে শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করছে। শ্রমিক ভাইদের বলছি, সবাই কাজে ফেরেন। কারো প্ররোচনায় পা দিবেন না। বিপদে পড়লে শ্রমিক ফেডারেশনকে পাশে পাবেন না।
বৈঠকে শ্রমিক নেতাদের পক্ষ থেকে জানানো হয় পোশাক কারখানাগুলোতে কার্যকর ট্রেড ইউনিয়ন না থাকায় এই আন্দোলন সেভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। আর সেই সুযোগ নিচ্ছে তৃতীয় পক্ষ।