ক্রসফায়ার নিয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের বক্তব্যের তীব্র সমালোচনার মধ্যে ব্যাখ্যা দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। সংস্থাটি বলেছে, আইন প্রয়োগের কঠোরতা বোঝাতে গিয়ে আইজিপি ক্রসফায়ার শব্দটি ব্যবহার করেছেন। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি এ শব্দ বলেননি।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) সন্ধ্যায় পুলিশ সদর দপ্তরের জ্যেষ্ঠ তথ্য কর্মকর্তা এ কে এম কামরুল আহসানের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ ব্যাখ্যা দেওয়া হয়।
এর আগে সোমবার সকালে রাজধানীর চকবাজারে কমিউনিটি ব্যাংকের চকবাজার ইসলামিক ব্যাংকিং শাখা উদ্বোধন অনুষ্ঠানে আইজিপি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ দমনে সরকার অনুমতি দিলে এবং প্রয়োজন হলে পুলিশ ক্রসফায়ার করতেও পিছপা হবে না। তাঁর এই বক্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা শুরু হয়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)সহ বিভিন্ন সংস্থা ও রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকেও বিবৃতি দেওয়া হয়।
পুলিশ সদর দপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশ পুলিশ রাষ্ট্রের প্রধান আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। অপরাধ দমন, অপরাধী গ্রেফতার, জনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পুলিশের মৌলিক দায়িত্ব। এসব দায়িত্ব পালনের সময় পুলিশ সদস্যদের কখনো কখনো অপরাধী, সংঘবদ্ধ হামলাকারী ও আইন অমান্যকারী ব্যক্তিদের প্রতিরোধ ও আক্রমণের মুখোমুখি হতে হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ২০২৬ সালের প্রথম ১০ মাসে পুলিশের ওপর ১৭৬টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলায় চারজন পুলিশ সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন এবং ৩৭০ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। আত্মরক্ষার অধিকার দেশের প্রচলিত আইন, বিশেষ করে দণ্ডবিধি-১৮৬০, ফৌজদারি কার্যবিধি-১৮৯৮ এবং পুলিশ অ্যাক্ট-১৮৬১-এ স্বীকৃত বলেও উল্লেখ করা হয়।
পুলিশ সদর দপ্তর জানায়, আইজিপি তাঁর বক্তব্যে মাদক কারবারি, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও জননিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টিকারী অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে পুলিশের দৃঢ় অবস্থান তুলে ধরেছেন। আইন প্রয়োগের কঠোরতা বোঝাতেই তিনি ক্রসফায়ার শব্দটি ব্যবহার করেছেন বলে বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়।
এদিকে একই অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের সম্পর্কে আইজিপির মন্তব্য নিয়েও ব্যাখ্যা দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সাংবাদিকদের সম্পর্কে তিনি ঢালাও কোনো মন্তব্য করতে চাননি। বিষয়টি অসাবধানতাবশত হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তির শেষাংশে বলা হয়, মানবাধিকার সমুন্নত রাখা, জনগণের জানমালের সুরক্ষা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় পেশাদারত্ব ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বাংলাদেশ পুলিশ।
‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে আইজিপির বক্তব্যে অধিকারের তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের মাধ্যমে ‘ক্রসফায়ার’-এর নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পক্ষে পুলিশ মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) দেওয়া বক্তব্যের তীব্র নিন্দা, ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’।
সোমবার ২৬ অক্টোবর এক সভায় পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোহাম্মদ আলী হোসেন ফকির বলেন, ‘সরকার অনুমোদন দিলে প্রয়োজনে ক্রসফায়ার করতেও পিছপা হবে না পুলিশ।’ আইজিপির এমন বক্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে অবিলম্বে তা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।
এক বিবৃতিতে অধিকার উল্লেখ করেছে, শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে দেশে ব্যাপকভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছিল। ওই সময় ভিন্নমতাবলম্বী ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষ ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হন। এসব বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের দায়ে বিলুপ্ত হওয়া সংস্থা র্যাবকে (বর্তমানে এসআরবি) যুক্তরাষ্ট্র কালো তালিকাভুক্ত করেছিল। হাসিনার আমলে সংঘটিত এসব মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং বর্তমান সরকারের আমলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারের সম্মুখীন হয়েছেন এবং জড়িতদের অনেকে বর্তমানে বিদেশে পালিয়ে আছেন।
সংস্থাটি মনে করে, পুলিশের সর্বোচ্চ পদধারী ব্যক্তির এ ধরনের বক্তব্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঢালাও ‘ছাড়পত্র’ দেওয়ার শামিল।
অধিকার আরও জানায়, বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ইতোমধ্যে ৫টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে তারা নথিভুক্ত (ডকুমেন্ট) করেছে।
আইজিপির এই ধরনের বক্তব্যের ফলে সৃষ্টি হওয়া পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে গভীরভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অধিকার। একই সঙ্গে পুলিশ মহাপরিদর্শকের বিতর্কিত এই বক্তব্য অবিলম্বে প্রত্যাহার করার দাবি জানানোর পাশাপাশি এই সময়ে সংঘটিত সব বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে অভিযুক্তদের বিচারের মুখোমুখি করার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।