আর্কাইভ | ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩, ১৬ জামাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ ০৫:০৫:৫৪ পূর্বাহ্ন
Photo
স্টাফ রিপোর্টার
ঢাকা, প্রকাশিতঃ
২৮ অক্টোবর ২০২৬
১০:০৪:১৭ পূর্বাহ্ন

বাংলাদেশ-জাপান ছয় সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর


প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চলমান জাপান সফরে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে ছয়টি দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা দলিল স্বাক্ষরিত হয়েছে।

পাশাপাশি দুটি প্রকল্পে প্রায় ২৯৫.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জাপান।

স্বাক্ষরিত দলিলগুলোতে সামুদ্রিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সম্পর্ক, কৃষি, কর্মসংস্থান, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ ও জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে গত ২৬ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরের বিভিন্ন অর্জনের বিষয়ে উপ প্রেস সচিব শাহাদাত স্বাধীন এ তথ্য জানান।

দলিলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের উপকূলীয় নিরাপত্তা সক্ষমতা জোরদারে একটি টহল জাহাজ সরবরাহের জন্য সর্বোচ্চ ২.১২ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন (১৩.৪৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) অনুদান চুক্তি রয়েছে।

এ ছাড়া, জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার ও ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নয়নবিষয়ক একটি সহযোগিতা স্মারক (এমওসি) স্বাক্ষরিত হয়েছে।

জাপানের কৃষি, বন ও মৎস্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের কৃষি মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পৃথক দুটি সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।

দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির কর্মসূচি (এমপ্লয়মেন্ট ফর স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম-ইএসডিপি) বিষয়েও একটি সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।

এ ছাড়া, জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সহযোগিতা জোরদারে জাপানের পরিবেশ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি আগ্রহপত্র (লেটার অব ইনটেন্ট-এলওআই) স্বাক্ষরিত হয়েছে।

অন্যদিকে, বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়নবিষয়ক একটি প্রকল্প বাস্তবায়নে ১৫.৮৮ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন (১০০.৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জাপান।

এ ছাড়া, উপজেলা পরিচালন ও উন্নয়ন প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায় বাস্তবায়নে ৩০.৬৮ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন (১৯৪.৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

দুটি প্রকল্পে ঋণের মোট পরিমাণ ৪৬.৫৬ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন, যা প্রায় ২৯৫.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান।

এসব দলিল, সহযোগিতা স্মারক ও ঋণের প্রতিশ্রুতিকে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত চার দিনের সরকারি সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সফরকালে দুই দেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে।

সফরকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপানের রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গেও বৈঠক করেন।

এসব বৈঠকে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, এর আগে, গত সোমবার (২৬ অক্টোবর) জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে চার দিনের সফরে জাপান আগমন করেন।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানসহ উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল তার সফরসঙ্গী হিসেবে জাপান আসেন।

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে : হুমায়ুন কবীর

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও জাপানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের পর দেশটির প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আগ্রহ বেড়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন জাপানের কাছে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

আজ বুধবার রাতে টোকিওতে বাংলাদেশ দূতাবাসে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্ব, গণতন্ত্রের প্রতি অঙ্গীকার এবং দেশের উন্নয়নে সরকারের নেওয়া উদ্যোগ জাপানের আস্থা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে গতকাল অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকেও বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ ও উন্নয়ন প্রচেষ্টার প্রতি জাপানের সমর্থনের বিষয়টি উঠে এসেছে।

তিনি বলেন, জাপানের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের জাতীয় উন্নয়ন প্রচেষ্টায় তাঁর সরকারের দৃঢ় সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। দুই দেশের সম্পর্ককে কেবল ঐতিহ্যগত বন্ধুত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে কৌশলগত অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে উন্নীত করার বিষয়ে উভয় পক্ষ গুরুত্ব দিয়েছে।

হুমায়ুন কবীর বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সফরকালে দুই দেশের মধ্যে ছয়টি সহযোগিতা দলিল স্বাক্ষর এবং দুটি ইয়েন ঋণ প্রকল্পে অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ ও বিভিন্ন খাতে সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তিনি জানান, সরকারি পর্যায়ের উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাতেও বাংলাদেশের প্রতি জাপানি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ছে। সফরকালে বিভিন্ন খাতে প্রায় ৬০০ কোটি মার্কিন ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগের বিষয়ে আগ্রহের কথা উঠে এসেছে। আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে বিনিয়োগ সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশকে বিদেশি বিনিয়োগের জন্য আরও আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে গড়ে তুলতে চান উল্লেখ করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, এ লক্ষ্যে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা, কর প্রণোদনা প্রদান, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানো এবং বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী আজ জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের (জেবিআইসি) গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং অবকাঠামো উন্নয়নে সহযোগিতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।

এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী জাপানি পোশাক ব্র্যান্ড ইউনিক্লোর সদর দপ্তর পরিদর্শন করেন এবং প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানান।

বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী, উৎপাদন সক্ষমতা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের সম্ভাবনা তুলে ধরে তিনি জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রার অংশীদার হতে অনুরোধ জানান।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) উদ্যোগে আয়োজিত বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরামেও প্রধানমন্ত্রী দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ অংশীদারত্ব সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী, দক্ষ জনশক্তি এবং নতুন বিনিয়োগ সম্ভাবনা জাপানি ব্যবসায়ীদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের সড়ক, রেলওয়ে ও অন্যান্য অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ অংশীদারত্ব গড়ে তোলার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করাই এসব উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।

হুমায়ুন কবীর বলেন, দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্র ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এই সফরে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং জাপানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব জোরদারের বিষয়টিই প্রাধান্য পেয়েছে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী প্রত্যাশা রেখে বলেন, আমরা আশা করি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে। 

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন ও উপ প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন উপস্থিত ছিলেন।