আর্কাইভ | ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩, ১৬ জামাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ ০৫:৫১:৩৪ পূর্বাহ্ন
Photo
আন্তর্জাতিক ডেস্ক 
ঢাকা, প্রকাশিতঃ
২৮ অক্টোবর ২০২৬
০৯:১৬:৪৮ পূর্বাহ্ন
আপডেটঃ
২৮ অক্টোবর ২০২৬
০৯:১৭:১৫ পূর্বাহ্ন

নেতানিয়াহুর ভাগ্য এখন তার শত্রুদের হাতে


ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক টিকে থাকার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আবারও হয়তো ক্ষমতা ধরে রাখতে পারবেন বলে মনে করা হচ্ছে। তাকে যে ‘জাদুকর’ বলা হয়, তা অকারণে নয়। তবে তার ভাগ্য এখন তার শত্রুদের হাতে। এক প্রতিবেদনে এ সংক্রান্ত বিস্তারিত তুলে দরেছে দ্য টেলিগ্রাফ।


মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বিকেলে ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার আগেই ইসরায়েলের সংবাদমাধ্যমগুলোতে বিরোধীদের বড় জয়ের পূর্বাভাস দেয়া হচ্ছিল। রেকর্ডসংখ্যক ভোটার উপস্থিতি বিরোধীদের পক্ষে গেছে এবং এর ফলে নেতানিয়াহুর ক্ষমতাসীন জোট পুরোপুরি ভেঙে পড়বে বলে ধারণা করেছিলেন বিশ্লেষকেরা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কয়েকজন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ঘোষণা করেছিলেন, ‘বিবি বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন!’ তাদের একজন আনন্দের সঙ্গে রেডিওর মাইক্রোফোনে এ কথা বলেছিলেন। অন্যরা ধারণা করেছিলেন, বেজালেল স্মোত্রিখের মতো কট্টরপন্থিরা নির্বাচনি সীমা অতিক্রম করতে ব্যর্থ হবেন। ফলে তাদেরও নেতানিয়াহুর সঙ্গে রাজনীতি থেকে অবসর নিতে হবে, নয়তো কারাগারে যেতে হবে।

মঙ্গলবার স্থানীয় সময় রাত ১০টায় প্রকাশিত এক্সিট পোলেও বিরোধী জোটের ৫২-৫০ আসনে জয়ের পূর্বাভাস দেয়া হয়। বড় ব্যবধানের জয় না হলেও এ ফলাফল প্রায় ৩০ বছর ধরে ইসরায়েলের রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করা এবং প্রায় ২০ বছর দেশটির শাসনক্ষমতায় থাকা নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক জীবনের অবসান ঘটাতে পারত।

কিন্তু বুধবার ইসরায়েলে নতুন দিনের সূর্য ওঠার পর এবং দুই-তৃতীয়াংশের বেশি ভোট গণনা শেষে পরিস্থিতি বদলে যেতে দেখা যাচ্ছে। লিকুদ-নেতৃত্বাধীন জোট এখন উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে। যদিও সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে এখনও পিছিয়ে, তবু নেতানিয়াহুর ক্ষমতায় টিকে থাকার বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।


যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও তা মনে করছেন। নিজের সমর্থনের প্রভাব নিয়ে কৃতিত্ব নিতেও দেরি করেননি তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন বিবি নেতানিয়াহুকে সমর্থন দিয়েছিলেন, তখন পুরো পরিস্থিতি বদলে যায়। একজন মহান প্রধানমন্ত্রীর নিশ্চিত পরাজয়ের পরিবর্তে এখন মনে হচ্ছে, তিনি ঘুরে দাঁড়িয়েছেন এবং তার জয়ও হতে পারে।’

ভোট গণনা শেষ না হওয়ায় সংখ্যাগুলো এখনও পরিবর্তিত হতে পারে। বুধবার ভোরে নির্বাচনি সমাবেশেও নেতানিয়াহু নিজে জয় দাবি করার বিষয়ে সতর্ক ছিলেন। সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘বন্ধুরা, এটি কেবল শুরু। আমরা এখনও চূড়ান্ত ফলাফলের অপেক্ষায় আছি। সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায় আগামী এক-দুই দিনের মধ্যে তা পাওয়া যাবে।’

সরকার নির্ধারণ করবে আরব দল!
তবে একটি বিষয় এখন স্পষ্ট বলেই মনে হচ্ছে- ইসরায়েলের দুটি আরব-ইসরায়েলি দল নির্বাচনে অত্যন্ত ভালো করেছে এবং দেশটির পরবর্তী সরকার গঠনে নির্ধারক ভূমিকা রাখতে পারে। সর্বশেষ ভোট গণনায় দল দুটি মিলে প্রায় ১৯টি আসন পেয়েছে। তারা যদি বিরোধীদের সঙ্গে সরকার গঠনের কোনো পথ খুঁজে পায়, তাহলে নেতানিয়াহুর ক্ষমতায় ফেরার সম্ভাবনা শেষ হয়ে যেতে পারে এবং বিরোধীরা ক্ষমতায় আসতে পারে।

এ ধরনের কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে হলে উভয় পক্ষকেই ছাড় দিতে হবে। নেতানিয়াহু এবারের নির্বাচনি প্রচারে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করার চেষ্টা করেছেন, যাতে ইহুদি-ইসরায়েলি রাজনীতিতে আরব-ইসরায়েলি দলগুলোর সঙ্গে যেকোনো সমঝোতা নিষিদ্ধ বা অগ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়। তার নির্বাচনি প্রচারের কট্টরপন্থি অংশের কয়েকজন এমন ধারণা দিয়েছেন যে, রা’আম বা জয়েন্ট লিস্টের সঙ্গে বসা মানে হামাস কিংবা ইরানকে আলিঙ্গন করা। অথচ এই দুটি আরব-ইসরায়েলি দলকে ভোট দেয়া প্রত্যেকেই ইসরায়েলের নাগরিক।

তবে অতীতে নেতানিয়াহুর লিকুদসহ জায়নবাদী দলগুলো সরকার গঠনের জন্য আরব-ইসরায়েলি দলগুলোর সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করার বিষয়টি বিবেচনা করেছে। এবারও তেমনটা ঘটার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। এদিকে বিরোধী জোটের বৃহত্তম দল ইয়াশারের নেতা গাদি আইজেনকোট বুধবার ভোরে দলীয় সমর্থকদের উদ্দেশে দেয়া বক্তব্যে আরব দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতার সম্ভাবনা নাকচ করেননি।

তিনি বলেন, ‘এত বেশি ভোটার উপস্থিতির পর আবার নির্বাচন আয়োজন করা ভুল হবে। জনগণের ইচ্ছাকে সম্মান জানাতে সম্ভাব্য সবকিছু করাই আমাদের দায়িত্ব, ব্যক্তিগতভাবেও আমার দায়িত্ব। আমি এবং ইয়াশার দল সব ইসরায়েলির প্রতিনিধিত্ব করতে চাই। পরিবর্তনের জন্য আমার অংশীদারদের সঙ্গে মিলে জনগণের সিদ্ধান্ত ও ইচ্ছাকে এমন একটি স্থিতিশীল জায়নবাদী সরকার গঠনে রূপ দিতে কাজ করব, যে সরকার সব ইসরায়েলি নাগরিকের সেবা করবে।’

সম্ভাব্য সমঝোতার জন্য একটি সূত্রও তুলে ধরেছেন আইজেনকোট। তিনি ও তার সহযোগীরা বলেছেন, জাতিগত বা ধর্মীয় কারণে আরব-ইসরায়েলি দলগুলোর সঙ্গে একসঙ্গে বসতে তাদের আপত্তি নেই। তাদের বক্তব্য, যে দল চারটি মূলনীতির প্রতি অঙ্গীকার করবে, তাদের সঙ্গেই তারা কাজ করতে রাজি। নীতিগুলো হলো- ইসরায়েলকে ইহুদি ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের মূল্যবোধের প্রতি অঙ্গীকার, একটি সর্বজনীন সেবা আইন পাসের প্রতিশ্রুতি এবং হামাসকে বিলুপ্ত করার অঙ্গীকার।

প্রশ্ন হলো, দুটি আরব-ইসরায়েলি দল কী এই চারটি নীতিতে সম্মত হতে পারবে? আর তারা সম্মত না হলে তাদের সমর্থকদের কী পরিণতি হবে?
মঙ্গলবার দক্ষিণ তেল আবিবের পুরোনো আরব বন্দর এলাকা জাফায় ভোটকেন্দ্রে দ্য টেলিগ্রাফের সঙ্গে কথা বলেছেন কয়েকজন আরব-ইসরায়েলি ভোটার। তাদের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, ভোটাররা সমঝোতা চান। তারা সবাই পুনর্মিলন ও শান্তির কথা বলেছেন।

৪৯ বছর বয়সী ইসরায়েলি ফিলিস্তিনি হুসাম জানিয়েছেন, তিনি মানসুর আব্বাসের নেতৃত্বাধীন সামাজিকভাবে রক্ষণশীল এবং একীভূতকরণের পক্ষে থাকা ইসলামপন্থি দল রা’আমকে ভোট দিয়েছেন। হুসাম বলেন, ‘আমরা শান্তির জন্য পরিবর্তন চাই। আমরা ইসরায়েলের রাজনীতির বাইরে নয়, ভেতরে থাকতে চাই।’

ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগে জাফায় জন্ম নেয়া ৮৮ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি ইয়োসিফ ইয়াহিয়া ভোট দিয়েছেন জয়েন্ট লিস্টকে। এটি মূলত বামপন্থি ইহুদি-আরব স্বার্থের প্রতিনিধিত্বকারী ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলোর একটি জোট। তিনি বলেন, ‘আমি চাই আরব ও ইহুদিদের জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হোক।’ ইয়াহিয়া আরও বলেন, ‘আমি জাফায় জন্মেছি, আমার প্রতিবেশীরা ছিলেন ইহুদি। আমরা বন্ধু ছিলাম। এই সরকার সবাইকে বিভক্ত করে দিয়েছে।’

২২ বছর বয়সী ইহুদি-ইসরায়েলি আরিয়েল ডেভিডভও জয়েন্ট লিস্টকে ভোট দিয়েছেন। তার মতে, মধ্য-বামপন্থি জায়নবাদী দল ডেমোক্র্যাটসের তুলনায় জয়েন্ট লিস্ট ফিলিস্তিনিদের কণ্ঠস্বরকে বেশি গুরুত্ব দেয়। তিনি বলেন, ‘আমি শান্তিতে থাকতে চাই। এমন একটি জায়গা চাই, যেখানে ঘৃণা থাকবে না। এমন একটি ইসরায়েল চাই, যেখানে সহিংসতা থাকবে না।’

আগের নির্বাচনগুলোতে বৈষম্যের প্রতিবাদে ইসরায়েলের আরব-ইসরায়েলি জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ভোট দেয়া থেকে বিরত ছিল। দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ২১ শতাংশ এই জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। এবার পরিবর্তনের আশায় তারা বিপুলসংখ্যায় ভোট দিয়েছে। তাদের নেতাদের বুঝতে হবে, সেই প্রত্যাশা পূরণ না হলে এমন সুযোগ হয়তো আর কখনো আসবে না।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, নেতানিয়াহুর ডানপন্থি সরকার নতুন করে ক্ষমতায় ফিরতে পারলে আরব-ইসরায়েলিদের জীবন দ্রুত আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। স্মোত্রিখসহ দলটির ডানপন্থি নেতারা শুধু পশ্চিম তীরকে সংযুক্ত করা এবং ব্যাপক হারে ফিলিস্তিনিদের দেশত্যাগে বাধ্য করার কথাই বলেননি, ইসরায়েলের অবশিষ্ট আরব-ইসরায়েলি এলাকাগুলোর ‘ইহুদিকরণ’-এর কথাও বলেছেন।

আগামী এক সপ্তাহে ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগ আরব-ইসরায়েলি দলসহ দেশটির সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের অবস্থান জানবেন। এরপর কোনো একটি দলকে পরবর্তী সরকার গঠনের জন্য ২৮ দিনের সুযোগ দেবেন তিনি। সেই চেষ্টা ব্যর্থ হলে অন্য পক্ষকে সরকার গঠনের সুযোগ দেয়া হবে। প্রয়োজন হলে এরপর দ্বিতীয়বার নির্বাচন আয়োজন করা হতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছে, নেতানিয়াহুকে কেবল তখনই ক্ষমতা ছাড়তে হতে পারে, যখন জায়নবাদী বিরোধী জোট এবং দুটি আরব-ইসরায়েলি দল হারজগকে জানাতে পারবে যে, তারা আলোচনা করেছে এবং একসঙ্গে সরকার গঠনের সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

মানসুর আব্বাসের নেতৃত্বাধীন রা’আম ইতিমধ্যে ‘পরিবর্তনপন্থি জোটে’ যোগ দেয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে। হামাসকে বিলুপ্ত করার লক্ষ্যে কাজ করার অঙ্গীকার করলেই দলটি আইজেনকোটের নির্ধারিত চারটি শর্ত পূরণ করতে পারবে। মঙ্গলবার রাতে সমর্থকদের উদ্দেশে আব্বাস বলেন, ‘আমরা সবাই মিলে এটি অর্জন করেছি। আমরা এই নির্বাচনি শক্তিকে প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দেব। আমরা এখানে আছি- রাজনীতির প্রান্তে পড়ে থাকার জন্য নয়।’

জয়েন্ট লিস্ট ঐতিহাসিকভাবে তুলনামূলক কম বাস্তববাদী অবস্থান নিয়ে এসেছে। তবে তাদের ভোটাররা যে হুমকির মুখে রয়েছেন, সে বিষয়েও দলটি সচেতন। মঙ্গলবার রাতে এক্সিট পোল প্রকাশের পর দলটির চেয়ারম্যান ইউসুফ জাবারিন বলেন, ‘কোনো রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেই আমাদের উপেক্ষা করা যায় না। তার দল বিবি, বেন গভির, স্মোত্রিখ এবং রক্তমাখা সরকারকে বাড়ি পাঠাতে চায়।’ জাবারিন আরও জানান, রা’আমের মতো জয়েন্ট লিস্টও বিরোধী জোটের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত, তবে তা তাদের শর্ত অনুযায়ী হতে হবে।

আগামী কয়েক দিনের মধ্যে বিরোধী জোটের সঙ্গে আলোচনা নির্ধারণ করবে, শেষ পর্যন্ত এই সমঝোতা বাস্তবে রূপ নেয় কি না। তাই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন আরব-ইসরায়েলিদের হাতেই নির্ভর করতে পারে।