আর্কাইভ | ঢাকা, রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬, ২৫ আশ্বিন ১৪৩৩, ২৭ রবিউস সানি ১৪৪৮ ০৪:৫৫:৫৮ পূর্বাহ্ন
Photo
বিশেষ প্রতিবেদক
ঢাকা, প্রকাশিতঃ
১০ অক্টোবর ২০২৬
১২:৫৬:০৭ অপরাহ্ন
আপডেটঃ
১০ অক্টোবর ২০২৬
০৪:৪০:৪৭ পূর্বাহ্ন

‘বাংলাদেশী’ আখ্যা দিয়ে কাউকে ফেরত পাঠানো যাবে না’


ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কলকাতা হাইকোর্টের এক বিচারপতি বলেছেন-‘শুধু প্রতিবেশীদের বক্তব্য বা সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে ‘বাংলাদেশী’ আখ্যা দিয়ে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো যাবে না। কাউকে বাংলাদেশী হিসেবে চিহ্নিত করে ফেরত পাঠানোর আগে তার নাগরিকত্ব প্রমাণের যথেষ্ট সুযোগ দিতে হবে’। এমন মন্তব্য করেছেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কলকাতা হাইকোর্টের এক বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য। তবে দেশটির আদালতের আদেশও মানছে না ভারতীয় সীামন্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। প্রতিদিনই বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে বাংলা ভাষাভাষি নাগরিকদের ধরে এনে জোর পূর্বক বাংলাদেশে পুশ ইনের চেষ্টা চলছে।

বাংলাদেশ ও ভারতের চার হাজার কিলোমিটারেরও বেশি বিস্তৃত সীমান্তজুড়ে নতুন এক উদ্বেগের নাম ‘পুশ ইন’। আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন, দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও সৌজন্যকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) প্রায় প্রতিদিনই ভারতীয় নাগরিক, বাংলাভাষী ভারতীয় কিংবা অবৈধভাবে ভারতে অবস্থানকারী ব্যক্তিদের জোরপূর্বক বাংলাদেশ সীমান্তে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সিলেটের গোয়াইনঘাট থেকে শুরু করে সাতক্ষীরার সুন্দরবনঘেঁষা সীমান্ত পর্যন্ত—বিএসএফের এই অনাকাঙ্ক্ষিত তৎপরতা এখন নিত্যদিনের চিত্রে পরিণত হয়েছে। বিজিবির (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) সতর্ক অবস্থান ও টহলের কারণে অনেক চেষ্টা ব্যর্থ হলেও সীমান্তজুড়ে এক ধরনের স্থায়ী উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলো থেকে আসা তথ্যে দেখা যায়, পুশ ইন থামেনি। বিশেষ করে সিলেট, মৌলভীবাজার, কুমিল্লা, যশোর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, দিনাজপুর এবং সাতক্ষীরা সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন রাতের আঁধারে কিংবা ভোরের আলো ফোটার আগেই ছোট ছোট দলে মানুষকে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। সীমান্তবর্তী বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামাজিক ইস্যু, বিশেষ করে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের নানা প্রক্রিয়ার জেরে একটি বিশাল জনগোষ্ঠীকে ‘বিদেশী’ বা ‘বাংলাদেশী’ আখ্যা দিয়ে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পাঠানোর অপচেষ্টা চলছে। বিএসএফ রাতের আঁধারে সীমান্তরেখা সংলগ্ন জিরো পয়েন্টে নিয়ে এসে এই মানুষদের ভয়ভীতি দেখিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে বাধ্য করে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রাত গভীর হলেই সীমান্তের কাঁটাতারের ওপারে বিএসএফের গাড়ি ও টর্চলাইটের আনাগোনা বেড়ে যায়। নদীর পার, ফসলি জমি কিংবা পাহাড়ি ছড়ার পথ ধরে ভারতের দিক থেকে দলে দলে মানুষকে নদী পার করে বা সীমান্ত ডিঙিয়ে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। বিএসএফের এই একপাক্ষিক ও অবৈধ তৎপরতা ঠেকাতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সীমান্তজুড়ে টহল ও নজরদারি কয়েক গুণ বৃদ্ধি করেছে। বিজিবির প্রতিটি ব্যাটালিয়ন ও বিওপি (বর্ডার আউটপোস্ট) সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। বিজিবির টহল দল দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা সীমান্ত পাহারা দিচ্ছে। বিএসএফ যখনই কোনো দল বা ব্যক্তিকে বাংলাদেশের সীমানায় ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে, তখনই বিজিবির বাধার মুখে পড়ে। বিজিবির এই সময়োচিত পদক্ষেপের কারণে হাজার হাজার মানুষকে পুনরায় ভারতের দিকে ফেরত (পুশ ব্যাক) পাঠানো সম্ভব হয়েছে।

বিজিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, পুশ ইনের শিকার ব্যক্তিদের বেশিরভাগই নিরুপায় ও বিএসএফের অমানুষিক নির্যাতনে ভীতসন্ত্রস্ত থাকেন। বিজিবি তাদের আটক করার পর নিয়ম অনুযায়ী পতাকা বৈঠকের (ঋষধম গববঃরহম) মাধ্যমে বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করে কিংবা আইনগত ব্যবস্থা হিসেবে স্থানীয় থানায় সোপর্দ করে। তবে বিএসএফ অনেক ক্ষেত্রেই নিজ দেশের নাগরিকদের বা ভারত থেকে আসা ব্যক্তিদের গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। যাদের সীমান্ত দিয়ে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, তাদের জীবনকাহিনী অত্যন্ত করুণ। এদের মধ্যে রয়েছে নারী, দুগ্ধপোষ্য শিশু, বৃদ্ধ এবং অসুস্থ মানুষ। দিনের পর দিন তাদের ভারতীয় সীমান্ত ফাঁড়িতে বা বন্দিশালায় আটকে রেখে অনাহারে- অর্ধাহারে নির্যাতন করা হয়, তারপর এক রাতে আচমকা সীমান্ত পার করে দেওয়া হয়। জানা গেছে, পুশ ইন করতে আনা ব্যক্তিদের অধিকাংশই ভারতের মহারাষ্ট্র, গুজরাট, দিল্লি, পশ্চিমবঙ্গ বা আসামের বিভিন্ন এলাকায় বহু বছর ধরে পরিচ্ছন্নতাকর্মী, দিনমজুর বা পোশাকশ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। অনেকের কাছে ভারতের ভোটার আইডেন্টিটি কার্ড, আধার কার্ড কিংবা রেশন কার্ড থাকা সত্ত্বেও পুলিশ ও বিএসএফ তা কেড়ে নিয়ে বা ছিঁড়ে ফেলে তাদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন-‘সীমান্তে বন্ধুত্বের বার্তা’ আর ‘জিরো কিলিং’-এর কথা কাগজে-কলমে বারবার বলা হলেও বাস্তব চিত্র অনেকটাই ভিন্ন। ভারতের সীমান্তে বিএসএফের এই অবিরাম পুশ ইনের চেষ্টা দুই দেশের পারস্পরিক ট্রাস্ট ও বন্ধুত্বের সুদৃঢ় ভিত্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও সীমান্ত সুরক্ষায় বিজিবি যেভাবে অকুতোভয় প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে, তা প্রশংসনীয় হলেও এর একটি স্থায়ী সামাজিক ও কূটনৈতিক সমাধান এখন সময়ের দাবি। সীমান্তকে অস্থিরতামুক্ত রাখতে এবং অমানবিক এই পুশ ইন বন্ধ করতে উভয় দেশের দায়িত্বশীল আচরণ এবং সমঝোতার বিকল্প নেই।

এদিকে, মেহেরপুরের গাংনীর শেওড়াতলা সীমান্ত দিয়ে দুই পুরুষ, এক নারী ও শিশুসহ চারজনকে পুশ-ইনের চেষ্টা করে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। তবে বিজিবির সতর্ক অবস্থান ও স্থানীয়দের সহযোগিতায় সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। পরে ওই চারজনকে ভারতের অভ্যন্তরে ফিরিয়ে নিয়ে যায় বিএসএফ। গতকাল শুক্রবার ভোররাতে গাংনী উপজেলার তেঁতুলবাড়িয়া ইউনিয়নের শেওড়াতলা সীমান্তে এ ঘটনা ঘটে। কুষ্টিয়া ব্যাটালিয়ন (৪৭ বিজিবি) সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার ভোর আনুমানিক ৩টার দিকে শেওড়াতলা বিওপির দায়িত্বপূর্ণ এলাকার সীমান্ত পিলার ১৪৪/৪-এস-এর কাছাকাছি এ ঘটনা ঘটে। ভারতের ১১ ব্যাটালিয়ন বিএসএফের বিজয় মাঠপাড়া ক্যাম্পের সদস্যরা চারজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। আগাম গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সীমান্তে সতর্ক অবস্থানে ছিল বিজিবির টহল দল। বিষয়টি শনাক্ত হওয়ার পর শেওড়াতলা বিওপির সদস্যরা স্থানীয়দের সহযোগিতায় বিএসএফের ওই প্রচেষ্টা প্রতিহত করেন। বিজিবির বাধার মুখে সকাল আনুমানিক ৬টার দিকে সীমান্তের ১০৪ নম্বর গেট দিয়ে ওই চারজনকে ভারতের অভ্যন্তরে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয় বিএসএফ। ঘটনার পর বিজিবি ও বিএসএফের কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বিএসএফের এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানায় বিজিবি। পাশাপাশি ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক পর্যায়ে বিএসএফের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদলিপি পাঠানোর কার্যক্রম চলছে। কুষ্টিয়া ব্যাটালিয়নের (৪৭ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাশেদ কামাল রনি জানান, সীমান্তে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সীমান্তে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, সীমান্তে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা কোনোভাবেই কাম্য নয়। বিষয়টি পতাকা বৈঠকে উত্থাপন করে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। পাশাপাশি আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদলিপি পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। ভবিষ্যতেও যেকোনো ধরনের অনুপ্রবেশ বা পুশ-ইনের চেষ্টা প্রতিহত করতে বিজিবি পেশাদারিত্ব, সতর্কতা ও দৃঢ়তার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবে।

কলকাতা হাইকোর্ট 

মুর্শিদাবাদের এক ব্যক্তিকে আটক ও বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগের বিরুদ্ধে করা একটি আবেদনের শুনানিতে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কলকাতা হাইকোর্টের এক বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য বলেছেন- শুধু প্রতিবেশীদের বক্তব্য বা সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে ‘বাংলাদেশী’ আখ্যা দিয়ে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো যাবে না। কাউকে বাংলাদেশী হিসেবে চিহ্নিত করে ফেরত পাঠানোর আগে তার নাগরিকত্ব প্রমাণের যথেষ্ট সুযোগ দিতে হবে। তিনি এ মন্তব্য করেন। ওই ব্যক্তির আইনজীবী আদালতকে জানান, কয়েকজন প্রতিবেশীর বক্তব্য থেকে তৈরি সন্দেহের ভিত্তিতে গত ৮ আগস্ট থেকে তার মক্কেলকে আটক রাখা হয়েছে।

ওই ব্যক্তির স্ত্রী তার স্বামীকে আটক রাখা এবং দম্পতিকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর নির্দেশের বিরুদ্ধে আদালতে আবেদন করেন। বিদেশী আঞ্চলিক নিবন্ধন দপ্তর (এফআরআরও) ওই নির্দেশ দিয়েছিল। তবে ওই ব্যক্তির স্ত্রীকে আটক করা হয়নি। বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য বলেন, বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর নির্দেশটি আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যথেষ্ট সুযোগ দেওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বিচারপতি বলেন, ‘মনে হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আবেদনকারীকে (আটক ব্যক্তি) নিজের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ দেয়নি।’ কেন ওই ব্যক্তিকে দুই মাস ধরে আটক রাখা হয়েছে এবং তার জাতীয়তা নির্ধারণে কর্তৃপক্ষ কেন ‘স্পষ্ট ও যাচাইযোগ্য প্রক্রিয়া’ অনুসরণ করেনি, তা জানতে চান বিচারপতি। ওই ব্যক্তির আইনজীবী রবিউল ইসলাম বলেন, আমার মক্কেল দুই মাসের বেশি সময় ধরে আটক রয়েছেন। কয়েকজন প্রতিবেশীর বক্তব্য থেকে তৈরি সন্দেহই তাকে আটকের ভিত্তি। বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য প্রশ্ন তোলেন, শুধু এ ধরনের বক্তব্যের ভিত্তিতে কীভাবে কারও জাতীয়তা নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব। যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কাউকে আটক রাখা যায় না উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন করেন, ‘১৯৭০-এর দশক থেকে কত মানুষ সীমান্ত পার হয়েছেন? তাদের সবাইকে কি ফেরত পাঠানো সম্ভব?’ এরপর বিষয়টি উপযুক্ত বেঞ্চে শুনানির জন্য হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠিয়ে দেন তিনি।