আর্কাইভ | ঢাকা, সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩, ২১ রবিউস সানি ১৪৪৮ ০৪:৩৫:৫০ পূর্বাহ্ন
Photo
স্টাফ রিপোর্টার
ঢাকা, প্রকাশিতঃ
০৪ অক্টোবর ২০২৬
০৯:০১:৪০ পূর্বাহ্ন

কী বোঝাতে চাইলেন ভারতীয় হাইকমিশনার?


হাসিনা সম্পর্কে ‘নতুন বার্তা’, কী বোঝাতে চেয়েছেন ত্রিবেদী

বিবিসি বাংলা: চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকেই মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে বারবার ফেরত চেয়ে আসছে বাংলাদেশ। প্রতিবারই এ ব্যাপারে অনাগ্রহ দেখিয়েছে প্রতিবেশী দেশ। তবে সম্প্রতি নতুন বার্তা দেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশন দীনেশ ত্রিবেদী। তিনি জানান, ভারত নাকি হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর কথা ভাবছে!

নতুন এই বার্তা দিয়ে কী বোঝাতে চেয়েছেন ভারতীয় হাইকমিশনার? কীসের ইঙ্গিত দিলেন তিনি?  


গত রোববার ঢাকায় একটি অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ বিষয়ে ইতিবাচক বার্তা দেন দীনেশ ত্রিবেদী। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে প্রস্তুতির আভাসের মধ্যেই তার দেওয়া এই বার্তা ঘিরে বেশ কৌতূহল তৈরি হয়েছে।

যদিও ত্রিবেদী ঢাকায় যা বলেছেন, সেটি শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পরদিন অর্থাৎ ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট ভারতের সংসদের উচ্চ-কক্ষ রাজ্যসভায় দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, তা থেকে ভিন্ন কিছু নয় বলেই মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।

তারা বলছেন, ত্রিবেদী বোঝাতে চেয়েছেন, বিষয়টি বাংলাদেশের এবং এই ইস্যুতে ভারত আটকে থাকতে ইচ্ছুক না। আবার কেউ কেউ বলছেন, শেখ হাসিনা সামরিক বিমানে করে ভারতে গেছেন, ভারতীয় সেনাবাহিনী তাকে নেয়নি- সেটি বাংলাদেশিদের সামনে স্পষ্ট করে তুলে ধরে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, ‘এর দায় ভারতের নয়’।

আবার এমন মতও আছে, ভারতের অবস্থান পরিষ্কার করে ত্রিবেদী বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের একটি আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।


চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল। এমন প্রেক্ষাপটে ত্রয়োদশ নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠনের পর ঢাকা-দিল্লি দুই পক্ষ থেকেই সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা অনেক ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান হয়ে উঠেছিল।

সবশেষ দুই পক্ষের মধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে সংকটের মধ্যেই গত ২৯ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর একটি সাক্ষাতের পর তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের ইস্যুটি নতুন করে আলোচনায় আসে।

কী বলেছেন ভারতীয় হাইকমিশনার?

ঢাকায় একটি বেসরকারি সংস্থা আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনের কর্মঅধিবেশনের প্রশ্নোত্তর পর্বে দীনেশ ত্রিবেদী শেখ হাসিনা প্রসঙ্গে কথা বলেছিলেন। মূলত ‘শেখ হাসিনাকে কবে হস্তান্তর করা হবে’- এমন এক প্রশ্নের জবাবে তিনি কথাগুলো বলেছেন।

ত্রিবেদী বলেন, ‘ভারত সরকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের মাধ্যমে বারবার এটি বলেছে যে, এর একটি প্রক্রিয়া রয়েছে। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে আইনি বিষয় জড়িত এবং এটি একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠিত। সে কারণে এ বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়া চালু রয়েছে। যেহেতু আদালত যুক্ত রয়েছে, তাই কেউ এ নিয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা বেধে দিতে পারে না।’

শেখ হাসিনার ভারতে যাওয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘হাসিনাজিকে ভারতীয় বিমান বাহিনী বা সেনাবাহিনী নিয়ে আসেনি। ওই সময় বাংলাদেশের বিয়োগান্ত ঘটনার কারণে তিনি এসেছিলেন। নিরপরাধ মানুষের প্রাণ দেওয়ার এমন ঘটনা সংঘটিত হওয়া উচিত ছিল না। আমরা আশা ও প্রার্থনা করি, যেন এমন ঘটনা আর কখনো না ঘটে, যেখানে নিরপরাধ মানুষ প্রাণ হারায়। তা বিশ্বের যেকোনো প্রান্তেই হোক না কেন।’

ভারতের হাইকমিশনার বলেন, সামরিক বিমানটি (শেখ হাসিনাকে বহনকারী) যখন ভারতে এসেছিল, তখন তার জন্য ভারত প্রস্তুত ছিল না।

তিনি বলেন, ‘আমি টিভিতে দেখছিলাম এবং স্ক্রলে লেখা উঠছিল যে, তিনি অন্য কোনো দেশে যাচ্ছেন। হাসিনাজি তখনো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। আমাদের প্রতিবেশী দেশ হিসেবে বাস্তবতাকে গ্রহণ করা ছাড়া খুব কম বিকল্পই ছিল। কারণ, পরিস্থিতি কখনো এমন হয় যে, যার জন্য আপনি আগে থেকে প্রস্তুত থাকেন না। আমাদের আর উপায় কী ছিল? আমরা যদি বলতাম--না, আমরা আপনাকে অবতরণের অনুমতি দেব না, তবে পরিস্থিতি কী হতো আমি জানি না। সে কারণে এটিই এর ঐতিহাসিক কারণ।’

ত্রিবেদী আরও বলেন, ‘দুই দেশের মধ্যেই চমৎকার সম্পর্ক ও বিভিন্ন পর্যায়ে সহযোগিতার ব্যবস্থা আছে এবং জাতীয় স্বার্থে উভয় দেশেরই সমান বন্ধু হিসেবে সংযোগ রাখা উচিত।’

জয়শঙ্কর কী বলেছিলেন?

শেখ হাসিনার ভারতে যাওয়া ও প্রত্যর্পণ ইস্যুতে দীনেশ ত্রিবেদীর মন্তব্য স্বাভাবিক কারণেই আলোচনায় উঠে এসেছে। একইসঙ্গে সামনে আসছে ভারতের রাজ্যসভায় দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর শেখ হাসিনা ইস্যুতে ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট যে বিবৃতি দিয়েছিলেন, সেটিও।

সেই বিবৃতির এক পর্যায়ে জয়শঙ্কর বলেছিলেন, ‘কারফিউ থাকা সত্ত্বেও ৫ আগস্ট বিক্ষোভকারীরা ঢাকায় জড়ো হন। আমাদের জানা মতে, নিরাপত্তা বিষয়ক শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠকের পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন।’

তিনি বলেন, ‘খুব কম সময়ের নোটিশে শেখ হাসিনা সাময়িকভাবে ভারতে আসার অনুমতি চান। একইসঙ্গে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ‘ফ্লাইট ক্লিয়ারেন্সের’ জন্যও অনুরোধ আসে আমাদের কাছে। তিনি গতকাল সন্ধ্যায় দিল্লি পৌঁছেছেন।’

কী বোঝাতে চাইলেন ভারতীয় হাইকমিশনার

কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতীয় হাইকমিশনার ঢাকায় বাংলাদেশি ও বিভিন্ন দেশ থেকে আসা প্রতিনিধিদের সামনে মূলত পরিষ্কার করে বোঝাতে চেয়েছেন, শেখ হাসিনা ইস্যুটি বাংলাদেশের এবং এতে ভারতকে দোষারোপ করা বা ভারতের এ বিষয়ে নিজ থেকে কিছু করার সুযোগ নেই।

দীনেশ ত্রিবেদী ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর আয়োজনের চেষ্টা করে যাচ্ছেন বলে অনেকের ধারণা।

যদিও বাংলাদেশের সরকারি মহল থেকে বারবারই শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের ইস্যুটি সামনে আনা হয়েছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রেও সরকার এটিকে অনেকটা শর্ত হিসেবে তুলে ধরেছে।

গত ১৬ আগস্ট বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম প্রেস ব্রিফিংয়ে স্পষ্ট করেই বলেন, ‘দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী শেখ হাসিনা এবং অন্যান্য পলাতক অপরাধীদের দ্রুত ফেরত পাঠাতে এবং শহীদ শরীফ ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত ঘাতকদের বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করতে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানিয়েছি। বাংলাদেশ এই জবাবের অপেক্ষায় আছে।’

ভারতের ওপি জিন্দাল ইউনিভার্সিটিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক ও দীর্ঘদিনের বাংলাদেশ গবেষক শ্রীরাধা দত্ত অবশ্য বলছেন, হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী নতুন কিছু বলেননি, বরং তিনি যা বলেছেন সেটিই ভারত সরকারের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য।

তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় না এর আর কোনো অর্থ আছে। এর মাধ্যমে ভিন্ন কিছু বোঝানোর চেষ্টা হয়েছে বলেও মনে হয় না। ওখানে (হাইকমিশনার যে অনুষ্ঠানে মন্তব্যগুলো করেছেন) ইন্টারন্যাশনাল অডিয়েন্স ছিল। সেজন্য হয়তো তিনি আরও স্পষ্ট করে সরকারের অবস্থানটাই তুলে ধরেছেন।’

যদিও বাংলাদেশি বিশ্লেষকরা বিষয়টিকে অতোটা সাদামাটা ভাবে দেখতে রাজি নন। তাদের কারও কারও মতে, হাইকমিশনার আগের চেয়ে বেশি ‘দৃঢ়তার সঙ্গে’ সামরিক বাহিনীর বিমানে শেখ হাসিনার ভারত যাওয়া এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা গেছেন- এই কথাগুলো মনে করিয়ে দিয়েছেন।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, ‘আমার মনে হয় হাইকমিশনার বলতে চেয়েছেন, বিষয়টা বাংলাদেশের। এ নিয়ে একপাক্ষিকভাবে ভারতের ওপর দায় চাপানোর সুযোগ নেই। তবে যেহেতু ভারত জড়িয়ে গেছে, সেজন্য হয়তো আইনি প্রক্রিয়ায় সমাধানের ওপর তিনি জোর দিয়েছেন।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমীন বলছেন, হাইকমিশনারের বক্তব্যে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের দিকে এগিয়ে নেওয়ার একটি আগ্রহ প্রকাশ পেয়েছে। বিষয়গুলো তুলে ধরে তিনি আসলে বোঝাতে চেয়েছেন, এক জায়গায় আটকে না থেকে আলোচনার মাধ্যমে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে হবে।’

এই অধ্যাপক আরও বলেন, ‘মনে হচ্ছে ত্রিবেদী চাইছেন, দুই দেশ আলোচনায় বসুক বা কথা বলুক। এক্ষেত্রে হয়তো শীর্ষ বৈঠক বা দুই প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতের প্রয়োজন আছে। কারণ এটা হলে বাকীগুলো নিয়ে এগুনো সহজ হবে। সূত্র: বিবিসি বাংলা