আর্কাইভ | ঢাকা, রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬, ২৫ আশ্বিন ১৪৩৩, ২৭ রবিউস সানি ১৪৪৮ ০৫:৪০:০৭ পূর্বাহ্ন
Photo
আন্তর্জাতিক ডেস্ক 
ঢাকা, প্রকাশিতঃ
১০ অক্টোবর ২০২৬
০৮:২৮:৪৪ পূর্বাহ্ন

পতনের দ্বারপ্রান্তে নরেন্দ্র মোদি!


ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আচরণই বলে দিচ্ছে তিনি পতনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছেন। বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র পক্ষ থেকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এমনই তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির (এআইসিসি) সাধারণ সম্পাদক কে সি বেণুগোপাল। 

দেশজুড়ে ভোটাধিকার রক্ষা এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে চলা রাজনৈতিক উত্তাপের মধ্যেই মোদি সরকারের বিরুদ্ধে এমন বিস্ফোরক মন্তব্য করেন এই শীর্ষ কংগ্রেস নেতা। 

ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া এবং নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে যখন দেশজুড়ে আন্দোলন দানা বাঁধছে, ঠিক তখনই কেন্দ্রের বিরুদ্ধে বিরোধীদের কণ্ঠরোধ করার অভিযোগ উঠেছে। 

কে সি বেণুগোপাল অভিযোগ করেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ মিলে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে আড়াল করার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন। তবে তাদের এই পদক্ষেপে সরকারের শেষ রক্ষা হবে না এবং এটিই তাদের পতনের মূল কারণ হয়ে দাঁড়াবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি আরও বলেন, মোদী সরকার বিরোধী দলের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে ভয় পায়, আর সেই ভয় থেকেই রাজধানী দিল্লি ও মুম্বাইসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা এবং কঠোর পুলিশি নিরাপত্তা কিংবা আটকের মতো দমনপীড়নমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। 

নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা এবং জনগণের ভোটাধিকার সুনিশ্চিত করার লড়াইয়ে আগামী সোমবার দিল্লিতে একটি বৃহৎ বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দিয়েছে 'ইন্ডিয়া' জোট। এর আগে বিরোধী নেতারা ভারতের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নিজেদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। 

আগামী সোমবার এই দাবির সপক্ষে দেশের প্রধান বিচারপতির (সিজেআই) সঙ্গেও জোটের শীর্ষ নেতাদের সাক্ষাতের কর্মসূচি রয়েছে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার না হওয়া পর্যন্ত বিরোধী দলগুলোর এই আন্দোলন সর্বস্তরে অব্যাহত থাকবে বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন কে সি বেণুগোপাল।


ককরোচদের বিক্ষোভে থমকে যাওয়া দিল্লিতে কী ঘটছে?

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী দিল্লির যন্তর মন্তরে পৌঁছাতে পারেননি দেশটির তরুণদের আন্দোলন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতারা। বিক্ষোভস্থলে পৌঁছানোর আগেই সিজেপিসহ দেশটির বিভিন্ন বিরোধীদলের শীর্ষ নেতাদের আটক করায় তাদের ‌‘যন্তর মন্তর ২.০’ কর্মসূচি ঘিরে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে এই প্রতিবাদ সমাবেশে লোকসমাগম কমাতে রাজধানীজুড়ে ব্যাপক ধরপাকড় চালিয়েছে দিল্লি পুলিশ। কেবল রাজধানী দিল্লিতেই দেড় হাজারের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

মুম্বাই থেকে দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এবং নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে আটক করেছে পুলিশ। সংগঠনটির আইন বিষয়ক প্রধান রত্ন সিংকেও আটক করা হয়েছে।


নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) প্রতিবাদে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে সিজেপির পূর্বনির্ধারিত ‘যন্তর মন্তর ২.০’ বিক্ষোভের কয়েক ঘণ্টা আগে এসব ঘটনা ঘটেছে।

দিল্লি পুলিশ বিক্ষোভের অনুমতি না দেওয়া সত্ত্বেও শনিবার কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছিল সিজেপি। এতে প্রায় ২০ হাজার মানুষের সমাগম হবে বলে প্রত্যাশা করা হয়েছিল। তবে মূল আয়োজকদের আটক এবং ব্যাপক পুলিশ মোতায়েনের কারণে বিক্ষোভের প্রস্তুতি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। দিল্লিজুড়ে পুলিশের পাশাপাশি দেশটির আধা-সামরিক বাহিনী সিআরপিএফের ৩৫ হাজারের বেশি সদস্যকে মোতায়েন করা হয়েছে।


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে বলতে শোনা যায়, বিমান অবতরণের ঠিক পরপরই দিল্লি পুলিশের নারী কর্মীরা তাকে এবং তার সহকর্মীদের আটক করতে বিমানের ভেতরে প্রবেশ করেন।

এ সময় ইনস্টাগ্রাম লাইভে দীপকে বলেন, ‘‘আপনারা দেখতে পাচ্ছেন, আমাদের আটক করতে দিল্লি পুলিশ বিমানের ভেতর প্রবেশ করছে। তারা সবাই বিমানের ভেতরে ঢুকছে। আমরা মাত্রই অবতরণ করেছি। দিল্লি পুলিশের সব কর্মকর্তা করিডোরে দাঁড়িয়ে আছেন। তারা বিমানের ভেতর থেকে আমাদের আটক করার চেষ্টা করছেন। পুরো দিল্লি পুলিশ বিমানে উঠছে। এটাই নরেন্দ্র মোদির ভয়।’’


তিনি বলেন, ‘‘জরুরি অবস্থার সময় ইন্দিরা গান্ধীও এমনটি করেননি। আমরা কেবল শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ করতে চেয়েছিলাম। আর তারা আমাদের এমনভাবে তুলে নিয়ে যাচ্ছে যেন আমরা কোনো অপরাধী।’’

একই ভিডিওতে সিজেপির অন্য দুই নেতা রাঙ্কা ও দাসকে ‘‘ভারত মাতা কি জয়’’ এবং ‘‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’’ স্লোগান দিতে শোনা যায়। সিজেপি শীর্ষ নেতাদের এই আটকের ঘটনাকে ‘‘বেআইনি’’ বলে অভিহিত বলেছে, নির্ধারিত বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার জন্য সিজেপি নেতাদের যন্তর মন্তরে পৌঁছাতে বাধা দিতেই এই পদক্ষেপ নিয়েছে পুলিশ।

• বিক্ষোভের আগে ইউটিউবার ধ্রুব রাঠী আটক
দিল্লি বিমানবন্দরে সিজেপির শীর্ষ নেতারা পৌঁছানোর প্রায় এক ঘণ্টা আগে সংগঠনটির সমর্থক ও ইউটিউবার ধ্রুব রাঠীকে দিল্লির সেক্টর ৫৬-এর বাসা থেকে গুরুগ্রাম পুলিশ আটক করেছে।

বিদেশে বসবাসকারী রাঠী এই বিক্ষোভে অংশ নিতে ভারতে এসেছিলেন। তার আটকের খবরটি এই আন্দোলনকে ঘিরে চলা অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সিজেপি আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়ায় দিল্লি ও এর আশপাশের এলাকায় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে পুলিশ।

• ৩৫ হাজার পুলিশ মোতায়েন, ইন্টারনেট বন্ধ ও যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা
সিজেপির এই জমায়েত ঘিরে দিল্লিকে কঠোর নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে রেখেছে স্থানীয় প্রশাসন। দেশটির এই রাজধানীতে নিয়মিত পুলিশের পাশাপাশি প্রায় ৩৫ হাজার অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি যন্তর মন্তরসহ দিল্লির গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন এলাকায় সিআরপিএফ ও কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্যও মোতায়েন রয়েছে।

নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে সিসিটিভি নজরদারি এবং দায়িত্বে থাকা কর্মীদের ইউনিফর্মে বডি ক্যামেরা যুক্ত করা হয়েছে। দিল্লি পুলিশের একটি অংশকে ‘পিংক ফোর্স’ হিসেবেও দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

যন্তর মন্তরের ৪ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে মোবাইল ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করেছে প্রশাসন। এছাড়া উত্তর প্রদেশ ও হরিয়ানার সঙ্গে দিল্লির সীমান্তবর্তী বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়ক এবং নয়াদিল্লির দিকে যাওয়া বিভিন্ন রুটে ট্রাফিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে কর্তৃপক্ষ।

যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে পুলিশ ক্যাব সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয় ও শত শত ট্রেনের যাত্রা বাতিল করেছে। রাজধানীতে সম্ভাব্য জনস্রোত নিয়ন্ত্রণ এবং বিশৃঙ্খলা এড়াতে বৃহত্তর নিরাপত্তা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মেট্রোসেবাও বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

সিজেপি অভিযোগ করে বলেছে, বিক্ষোভস্থলে পৌঁছানোর আগেই আয়োজকদের আটক শান্তিপূর্ণ আন্দোলন প্রতিহত করার একটি সরকারি অপচেষ্টা।

• বন্ধ মদের দোকান, থমকে গেছে ব্যবসা-বাণিজ্য
সিজেপির বিক্ষোভকে ঘিরে প্রশাসনের এসব নিষেধাজ্ঞা কেবল নিরাপত্তা ও যাতায়াতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ৯ ও ১০ অক্টোবর দিল্লির সব মদের দোকান বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

দিল্লির প্রধান শহরের কিছু অংশে, বিশেষ করে কনট প্লেস এলাকায় বাণিজ্যিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কনট প্লেস, সদর বাজার এবং করোলবাগ ও চাঁদনি চকের কিছু অংশের বাজার সমিতি ১০ অক্টোবর দোকানপাট বন্ধ রাখার তথ্য নিশ্চিত করেছে।

তবে গ্রিন পার্ক, সরোজিনী নগর এবং গ্রেটার কৈলাসের বাজারগুলো খোলা রয়েছে। আন্দোলনকে কেন্দ্র করে কড়াকড়ি ও দোকানপাট বন্ধ থাকায় মানুষের মাঝে এক ধরনের স্থবিরতা নেমে এসেছে। বিক্ষোভের প্রধান আয়োজকদের আটক করায় বিক্ষোভের চূড়ান্ত রূপ কী দাঁড়াবে তা নিয়ে সংশয় থাকলেও কর্তৃপক্ষ বড় ধরনের জনসমাগমের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে।

• সিইসিকে অপসারণের দাবিতে রাহুলের সমর্থন, তবে...
এসআইআর প্রক্রিয়ার বিরোধিতাকারী সিজেপি ও অন্যান্য বিরোধী দলগুলোর মূল দাবির সুরেই জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণের দাবি জানিয়েছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি বলেছেন, ‘‘জ্ঞানেশ কুমার চলে যাবেন। এই সরকার চলে যাবে।’’

তিনি লেখেন, তারপর গণতন্ত্রের মেরামত শুরু হবে। পোস্টের শেষে ভারতের জাতীয় পতাকার ইমোজি যুক্ত করেছেন রাহুল গান্ধী।

তবে সিজেপির পরিকল্পিত এই বিক্ষোভ থেকে দূরে রয়েছে কংগ্রেস। রাহুল গান্ধী তার রাজনৈতিক মিত্র ও তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী বিজয়ের এক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে চেন্নাইয়ে গেছেন।

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া, এনডিটিভি।