আর্কাইভ | ঢাকা, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬, ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩, ২৪ মহররম ১৪৪৮ ১২:৪৮:৪৭ পূর্বাহ্ন
Photo
বিশেষ প্রতিবেদক 
ঢাকা, প্রকাশিতঃ
১০ জুলাই ২০২৬
০৮:২০:৪৬ পূর্বাহ্ন

বন্যায় হাজারো পরিবার পানিবন্দি, চরম দুর্ভোগ


টানা অতি ভারী বর্ষণের ফলে সৃষ্ট বান্দরবানের বন্যা পরিস্থিতি এখনো আগের মতো আছে। কিছু নিম্নাঞ্চল থেকে পানি কমতে শুরু করলেও জেলা শহর ও লামার বিভিন্ন এলাকায় এখনো কয়েক ফুট পানি রয়েছে। সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ায় দুর্ভোগে পড়েছেন শিক্ষার্থী, রোগীসহ সাধারণ মানুষ।


গত ৫ জুলাই থেকে টানা অতিভারী বর্ষণের পর বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) দিনভর জেলাজুড়ে থেমে থেমে বৃষ্টি হয়েছে। আজ শুক্রবার সকাল থেকে বৃষ্টি না হওয়ায় কিছু নিম্নাঞ্চল থেকে পানি কমতে শুরু করেছে।

তবে, জেলা শহরের আর্মিপাড়া, হাফেজঘোনা, বালাঘাটা, কালাঘাটা, ইসলামপুর, ক্যাচিংঘাটা এবং লামা পৌরসভার প্রধান বাজার, চেয়ারম্যান পাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় এখনো ৪-৫ ফুট পানি রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন জায়গায় পাহাড়ধস এবং গাছ ভেঙে পড়ে সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে। সড়কপথ বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থী ও অসুস্থ রোগীসহ স্থানীয় বাসিন্দাদের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

বান্দরবান আবহাওয়া অধিদপ্তরের ইনচার্জ রিঙ্কু দে জানান, বান্দরবানে গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা থেকে আজ শুক্রবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ১৩১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। যা অতি ভারী বৃষ্টিপাত। ৫ জুলাই সকাল ৬টা থেকে ১০ জুলাই সকাল ৬টা পর্যন্ত ১২০ ঘণ্টায় সর্বমোট বৃষ্টিপাত হয়েছে ৮৯১ মিলিমিটার।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অপু দেব জানান, সাঙ্গু ও মাতামুহুরি নদীতে পানি কিছুটা কমলেও এখনও বিপৎসীমার এক থেকে দেড় ফুট ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। বন্যার কারণে লামা বাজারে বুধবার বিকেলে হঠাৎ পানি ঢুকে পড়ায় ব্যবসায়ীরা মালামাল সরাতে পারেননি। ফলে লাখ লাখ টাকার সম্পদহানি হয়েছে। বন্যার কারণে বান্দরবান-কেরানিহাট সড়কের বাজালিয়া পয়েন্টের রাস্তা ২ ফুট পানির নিচে তলিয়ে যায়। এতে বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের সঙ্গে যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন ছিল।

রুমায় বিদ্যুৎ ও সড়ক যোগাযোগ বন্ধ থাকায় অচল অবস্থা বিরাজ করছে। জেলার ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ইতোমধ্যে ২ হাজার ১৭৩ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। জেলা প্রশাসন, পৌরসভা ও বিভিন্ন সংস্থার উদ্যোগে ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। সেনাবাহিনী, বিজিবি ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থানরত মানুষ এবং বিভিন্ন ছাত্রাবাসে আটকে পড়া শিক্ষার্থীদের খাবার ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। 

এদিকে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বন বিভাগের উদ্যোগে ৯ জুলাই থেকে শুরু হতে যাওয়া সপ্তাহব্যাপী বৃক্ষমেলা স্থগিত করা হয়েছে।

কক্সবাজারে বন্যায় ২ শিশুর মৃত্যু, পানিবন্দি ৩ লক্ষাধিক মানুষ

কক্সবাজারে বন্যার পানিতে ডুবে চকরিয়া ও মাতামুহুরীতে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া চকরিয়া, নবগঠিত মাতামুহুরী ও পেকুয়া উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। টানা পাঁচ দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢলে শতাধিক গ্রাম তলিয়ে যাওয়ায় এসব উপজেলায় প্রায় তিন লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। 


বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) বিকেল ৫টার দিকে চকরিয়ায় কাকারা ইউনিয়নে মাইজ কাকারা এলাকায় পানিতে ডুবে প্রাণ হারায় স্থানীয় সোলতান আহমদের ২ বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ ওয়াকিম।

একই দিন সকালে বন্যার পানিতে ভেসে গিয়ে মাতামুহুরী উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নের চরপাড়া এলাকার আরিফুল ইসলামের ছেলে পুষ্প (৩) এর মৃত্যু হয়।

চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীন দেলোয়ার ( মাতামুহুরী উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত) বলেন, বন্যায় নিহত দুই শিশুর পরিবারকে নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। নদীর পানি বেড়ে লোকালয়ে প্রবেশ করায় জনপ্রতিনিধিদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।


পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি পানি দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য উপকূলীয় ইউনিয়নগুলোর স্লুইস গেট খুলে দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। 

মাতামুহুরী ও সাঙ্গু নদীর পানি বিপৎসীমার উপরে থাকায় চকরিয়ার বরইতলী, বমুবিলছড়ি, কাকারা, লক্ষ্যারচর, চিরিঙ্গা ও হারবাং ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে রয়েছে।

এছাড়াও নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার পূর্ব বড়ভেওলা, ঢেমুশিয়া, কোনাখালী, বিএমচর ও সাহারবিল ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলও প্লাবিত হয়েছে।


অন্যদিকে পেকুয়ার উজানটিয়া, মগনামা, বারবাকিয়া, মেহেরনামা এবং পৌর এলাকার বিভিন্ন স্থানে বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে। সড়ক, কৃষিজমি ও চিংড়ির ঘের ডুবে যাওয়ায় জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।

কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম জানান,  বাঁকখালী নদীর পানি ৫ দশমিক ৮৮ মিটার এবং মাতামুহুরী নদীর পানি ৬ দশমিক ৫৪ মিটারে পৌঁছেছে, যা বিপৎসীমার চেয়ে বেশি। 

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান বলেন, জেলার ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র সম্পূর্ণ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ এবং জরুরি সহায়তা কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে একটি কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে। 

জরুরি প্রয়োজনে সাধারণ মানুষকে কন্ট্রোল রুমের ০১৮৭২৬১৫১৩২ এ সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করার আহ্বান জানান জেলা প্রশাসক।  কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ আব্দুল হান্নান জানান, গত পাঁচ দিনে জেলায় প্রায় ৭শ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।