আর্কাইভ | ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬, ১১ আষাঢ় ১৪৩৩, ৮ মহররম ১৪৪৮ ১১:৫৯:০৯ অপরাহ্ন
Photo
স্টাফ রিপোর্টার
ঢাকা, প্রকাশিতঃ
২৫ জুন ২০২৬
০৯:১৯:৩০ পূর্বাহ্ন
আপডেটঃ
২৫ জুন ২০২৬
০৯:২২:২২ পূর্বাহ্ন

ঢাবি ছাত্রীসহ একই পরিবারের ৪ জনকে কুপিয়ে হত্যার কারণ কি? 


লক্ষ্মীপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) এক শিক্ষার্থীসহ একই পরিবারের চারজনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে একজন নারী এবং বাকি তিনজন তার মেয়ে। পরে ঘাতককেও পিটিয়ে হত্যা করেছে জনতা। সব মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে পাঁচজনে। ঘটনাটি দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এই ঘটনার রহস্য উদঘাটনে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এই হত্যার নেপথ্যে কী সেটা নিয়ে কৌতূহল রয়েছে স্থানীয়দেরও।  

এ ব্যাপারে লক্ষ্মীপুর জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) আবু তারেক ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেন, ঠিক কী কারণে নৃশংস এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে, তা আপাতত জানা যায়নি। তদন্ত করে বিস্তারিত জানানো হবে বলে তিনি জানান।


এর আগে বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকালে জেলার রায়পুর পৌরসভার ৩নং ওয়ার্ডের গোডাউন রোড এলাকার ভাড়া বাসায় মা ও তার তিন মেয়েকে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করে অন্তর মজুমদার নামে এক যুবক। 


ঘটনার পর স্থানীয়রা মা ও তিন মেয়েকে উদ্ধার করে সদর হাসপাতালে নিলে দায়িত্বরত চিকিৎসক মা এবং দুই মেয়েকে মৃত ঘোষণা করেন। গুরুতর আহতাবস্থায় আরেক মেয়েকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। কিন্তু তাকেও বাঁচানো যায়নি। 

নিহতদের বাড়ি কুমিল্লায়। তারা রায়পুর পৌরসভার ৩নং ওয়ার্ডের গোডাউন রোড এলাকা কয়েক বছর ধরে ভাড়া থাকতেন। নিহতদের মধ্যে সায়মা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। আরেক বোন ইকরা পড়তেন রায়পুর কাজী ফারুকী কলেজে দ্বাদশ শ্রেণিতে। 

তবে কী কারণে মা এবং তার তিন মেয়েকে এভাবে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হলো এবং ঘটনার সঙ্গে অন্তর মজুমদার নামে ওই যুবক ছাড়াও আরও কেউ জড়িত আছে কি না, তা জানাতে পারেননি স্থানীয়রাও। 

এদিকে ঘটনার পর উত্তেজিত জনতার গণপিটুনিতে গুরুতর আহত হন ঘাতক যুবক অন্তর মজুমদার। পরে তাকে পুলিশে দেওয়া হয়। পুলিশ তাকে সদর হাসপাতালে নিলে তিনিও মারা যান। 

এ তথ্য নিশ্চিত করেন সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. অরুপ পাল।

ঘাতক ও নিহত অন্তর মজুমদার নোয়াখালীর সূবর্নচরের কার্তিক মজুমদারের ছেলে বলে জানা যায়। 

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, কয়েক বছর আগে শাহীনুরের স্বামী মো. কামাল বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। এরপর থেকে তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে তিনি রায়পুরে ভাড়া বাসায় থাকতেন। প্লাস্টিক পণ্য হকারি করে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতো পরিবারটি। কিন্তু ৫ সদস্যের পরিবারের চারজনই এখন পরপারে। 

জানা যায়, ঘাতক যুবক অন্তর মজুমদার কয়েক মাস আগে নিহত শাহীনুরদের সঙ্গে একই বিল্ডিংয়ের ভাড়া থাকতেন। তিনি ফল বিক্রেতা ছিলেন। তার সঙ্গে শাহীনুরদের পরিবারের কোনো ঝামেলা ছিল কি না, সেটাই জানার চেষ্টা করছে পুলিশ। 


একসঙ্গে মা ও তিন বোনকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ একমাত্র ছেলে সিফাত

লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে ৭ বছর আগে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে স্বামী কামাল হোসেনকে হারিয়ে ৩ মেয়ে ও একমাত্র ছেলেকে নিয়ে বহু কষ্টে শাহিনুর বেগম সংসার টেনে নিচ্ছিলেন। তবে বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকালে ওই সংসারে কালো মেঘ নেমে আসে। 


একে একে তিন মেয়ে সায়মা আক্তার (২১), ইকরা আক্তার (১৭) ও শিফা আক্তার (৯) এবং মা শাহিনুরকে (৩৮) কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তবে বাসায় না থাকায় বেঁচে যান একমাত্র ছেলে সিফাত হোসেন (১৮)।

সিফাত রায়পুর বণিক সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম মুরাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি এখানে কর্মরত। সকালবেলা সিফাত তার বাসার অদূরেই কর্মস্থলে চলে যান।

সিফাতের বরাত দিয়ে রায়পুর বণিক সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম মুরাদ বলেন, সকালে সিফাত দোকানে আসে। পরে বেলা ১১টার দিকে তার মা ও বোনদের কুপিয়ে হত্যার খবর আসে। আমার দোকানের পেছনেই তাদের বাসা। লোকজন জড়ো হয়ে ঘাতক যুবককে গণপিটুনি দেয়। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।


এদিকে একসঙ্গে মা ও তিনবোনের মৃত্যুতে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন সিফাত। প্রথমে ঘটনা শুনে বাসায় গিয়ে বুক চাপড়ে তিনি কান্নাকাটি করতে থাকেন। তার কান্নায় পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। স্থানীয়দের ধারণকৃত একটি ভিডিওতে তার গগনবিদারি কান্নার দৃশ্য দেখা যায়। পরে তাকে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে বণিক সমিতির নেতার বাসায় নিয়ে রাখা হয়। সেখান থেকে তাকে একবার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে তাকে গাড়িতে নিয়ে এসে ফের বণিক সমিতির নেতার বাসায় রাখা হয়।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০১৯ সালে সিফাতের বাবা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। তখন পরিবারের বড় মেয়ে রায়পুর মার্চেন্টস একাডেমিতে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন। অন্যরা বিভিন্ন শ্রেণিতে পড়ালেখা করতেন। এছাড়া ছোট মেয়ে শিফা প্রায় দুই বছর বয়সী ছিলেন। এর মধ্যে বড় মেয়ে সায়মা এসএসসি পাস করে আদমজী ক্যান্টমেন্ট কলেজে ভর্তি হন। সেখান থেকে এইচএসসি পাস করে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেলে ভর্তির জন্য চেষ্টা করেন। সর্বশেষ কোথাও ভর্তি হননি তিনি। মেজো মেয়ে স্থানীয় লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন বলে জানা গেছে। আর ছোট মেয়েও স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছিল।


একমাত্র ছেলে পড়াশোনার পাশাপাশি একটি দোকানে চাকরি নেন। সিফাত রায়পুর সরকারি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র। 

নিহত সায়মার একসময়ের ক্লাসমেট প্রমি আক্তার বলেন, সাইমা মেধাবী শিক্ষার্থী ছিল। সে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে বের হয়েছে। এর মধ্যে সে মেডিকেল ভর্তির জন্যও চেষ্টা করেছিল। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছে। তবে ভর্তি হয়েছে কিনা জানি না।

সিফাতের বরাত দিয়ে বণিক সমিতির নেতা সাইফুল ইসলাম মুরাদ বলেন, সিফাতের বাবা মারা যাওয়ার পর তা মা খুব কষ্টে সংসার চালিয়েছে। বছরখানিক ধরে সিফাত আমার এখানে কাজ করে। এখন তার তিন বোনসহ মাকেও কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ছেলেটির আর কেউ নেই এ পৃথিবীতে। গ্রামের বাড়িতে আত্মীয়-স্বজন কে আছে তা বলতে পারেননি তিনি।

রায়পুর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীন মিয়া বলেন, একই পরিবারের ৪ জনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তাদের বাড়ি কুমিল্লায়। পরিবারের একমাত্র ছেলে বেঁচে আছে। স্বজনদেরকে খবর দিতে বলা হয়েছে। নিহতদের মরদেহ হাসপাতালের মর্গে আছে। আশা করি দ্রুত সময়ের মধ্যে স্বজনরা এসে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ বুঝে নেবেন। এছাড়া ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে রতন মজুমদার (২৮) নামে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করেছে ক্ষুব্ধ জনতা। তার বাড়ি শুনেছি নোয়াখালীর সুবর্ণচরে। তবে সঠিক ঠিকানা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।