আর্কাইভ | ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪ মার্চ ২০২৬, ১০ চৈত্র ১৪৩২, ৪ শা‍ওয়াল ১৪৪৭ ০৭:০৬:২৪ অপরাহ্ন
Photo
বিশেষ প্রতিবেদক 
ঢাকা, প্রকাশিতঃ
২৪ মার্চ ২০২৬
০১:৪১:৫৪ পূর্বাহ্ন

কেন আলোচিত মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী? এক-এগারোতে কী ছিল ভূমিকা 


বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে আলোচিত দিন ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি। দিনটি ওয়ান ইলেভেন বা এক-এগারো হিসেবে পরিচিত। দেশব্যাপী রাজনৈতিক গোলযোগ ও বিশৃঙ্খলার মধ্যে সেদিন সেনাবাহিনীর সমর্থনে দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয়। পরদিন গঠিত হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার। শুরু হয় সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসনকাল। ক্ষমতার সেই অস্বাভাবিক পটপরিবর্তনে যারা কুশীলবের ভূমিকা পালন করেন তাদের অন্যতম লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী।

এক-এগারোর আলোচিত এই সেনা কর্মকর্তা পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে রাষ্ট্রদূত হন। যুক্ত ছিলেন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গেও। পরে দল পাল্টে ভিড়েন জাতীয় পার্টিতে। দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্যও হন। লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে সংসদেও যান। চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে তিনি অনেকটা আড়ালে চলে যান। তবে গতকাল সোমবার (২৩ মার্চ) মধ্যরাতে গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে তিনি নতুন করে আলোচনায় এসেছেন। তার বিরুদ্ধে পাঁচটি মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে। সেসব মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখিয়েছে পুলিশ।


অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর পৈতৃক বাড়ি ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার মতিগঞ্জ ইউনিয়নের সুলাখালী গ্রামে। ১৯৭৫ সালে রক্ষী বাহিনী গঠিত হলে সেই বাহিনীতে ছিলেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। পরে তাদের সেনাবাহিনীতে আত্মীকরণ করা হয়। তিনি ২০০৭ সালে সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশনের জিওসির দায়িত্বে ছিলেন। তিনি এক-এগারোর পট পরিবর্তনে অন্যতম প্রধান ভূমিকায় ছিলেন। তখন তিনি গুরুতর অপরাধ দমন-সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটির সমন্বয়ক হন এবং পদোন্নতি পেয়ে লে. জেনারেল হন। এই কমিটির অধীনেই দুর্নীতিবিরোধী অভিযান পরিচালিত হয়। ২০০৮ সালে মাসুদ উদ্দিন অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার নিযুক্ত হন। এরপর আওয়ামী লীগ সরকার তিন দফায় তাঁর চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধি করে। অবসরগ্রহণের পর তিনি ঢাকায় রেস্তোঁরাসহ একাধিক ব্যবসায় যুক্ত হন।


২০১৮ সালের নির্বাচনে আগে শেখ হাসিনা তাকে নিজ দল থেকে সংসদ সদস্য করার সিদ্ধান্ত নেন। তবে এক পর্যায়ে তিনি মনে করেন, এক-এগারোর এই সেনা কর্মকর্তাকে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন দেওয়া হলে এ নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়বে দল। তা ছাড়া আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরমেও এক-এগারোর সময়ের ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চেয়ে একটি ঘর রাখা হয়েছিল। এই অবস্থায় আওয়ামী লীগের মিত্র জাতীয় পার্টি থেকে তাকে মনোনয়ন চাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। অনেকটা শেখ হাসিনার নির্দেশেই মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে মনোনয়ন দেয় জাতীয় পার্টি এবং রাতারাতি দলের প্রেসিডিয়াম সদস্যও করা হয়। ‘রাতের ভোট’ হিসেবে পরিচিত সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আশীর্বাদপুষ্ট মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী অনায়াসে বিজয়ী হয়ে আসেন। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের শেখ হাসিনার ‘আমি-ডামি’ নির্বাচনেও তিনি বিজয়ী হন। 

ওয়ান ইলেভেন সরকার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ রাজনীতিবিদদের চরিত্র হরণ এবং নানা ধরনের নিপীড়নের যে ছক আঁকে এর নেপথ্যে মূল ভূমিকা রাখেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। তিনি তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। তিনি নির্দেশেই বিএনপি ও আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ রাজনীতিকদের পাশাপাশি দেশের শীর্ষ কয়েকজন ব্যবসায়ীকেও আটক করা হয়।

সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’র মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বকে পাল্টে ফেলে রাজনীতিকে নতুন চেহারা দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ ওঠে। এর নেপথ্যে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল বলে মনে করা হয়। তবে শেখ তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে দায়মুক্তি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসা শেখ হাসিনা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে শুধু দায়মুক্তিই দেননি, তাকে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাই কমিশনার করে পাঠান। ২০১১ সালের জুন পর্যন্ত তিনি সেই দায়িত্বে ছিলেন। পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনার আশীর্বাদে তিনি সংসদ সদস্যও নির্বাচিত হন।