আর্কাইভ | ঢাকা, রবিবার, ২২ মার্চ ২০২৬, ৮ চৈত্র ১৪৩২, ২ শা‍ওয়াল ১৪৪৭ ১১:৫৩:৩৬ অপরাহ্ন
Photo
এখন বাংলা ডেস্ক
ঢাকা, প্রকাশিতঃ
০১ মার্চ ২০২৬
০৭:১২:৪৮ পূর্বাহ্ন
আপডেটঃ
০১ মার্চ ২০২৬
০৭:১৩:০৩ পূর্বাহ্ন
৪০ দিনের জাতীয় শোক, ৭ দিন সরকারি ছুটি ঘোষণা

মার্কিন-ইসরাইলি হামলায় শহীদ হলেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা


ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী শাহাদাতবরণ করেছেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন

ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, আজ (রোববার) ভোরে আমেরিকা-ইসরায়েলের হামলা তিনি নিজ কর্মস্থলে শাহাদত বরণ করেন। সর্বোচ্চ নেতার মেয়ে, জামাতা এবং নাতির শাহাদাতের খবরও নিশ্চিত করা হয়েছে। এটাও বলা হয়েছে যে, আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ীর পুত্রবধূদের একজন শনিবার সকালে হামলায় শহীদ হয়েছিলেন।

ইহুদিবাদী ও পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো বারবার দাবি করে আসছিল যে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা একটি নিরাপদ এবং গোপন স্থানে বাস করেন। কিন্তু কর্মস্থলে তার শাহাদাত আবারও এই দাবিগুলোর অসারতা প্রমাণ করল।  

ইমাম খামেনেয়ীর শাহাদাতের পর ইরানের মন্ত্রিসভার বিবৃতিতে বলা হয়েছে, "দুঃখ ও পরিতাপের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অপরাধী সরকার এবং কুখ্যাত ইহুদিবাদী ইসরায়েলের নৃশংস হামলার পর, ইসলামী বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ ইমাম খামেনেয়ী শহীদ হয়েছেন। তিনি ৩৭ বছরেরও বেশি সময় ধরে ইসলামি ফ্রন্ট ও মুসলিম উম্মাহ প্রকৃত নেতৃত্ব এবং পতাকার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। তার অনুকরণীয় সাহস এবং দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে ইসলামের ইতিহাসে এবং অবিশ্বাসের বিরুদ্ধে তাঁর আশীর্বাদ ও ঐতিহাসিক জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত একটি নতুন অধ্যায় চিহ্নিত করেছিলেন।"

ইরানের সর্বোচ্চ নেতার শাহাদাতের খবর নিশ্চিত করার পর থেকেই তেহরানের ইনকিলাব স্কয়ারে দেশের সর্বস্তরের শোকার্ত মানুষ সমবেত হচ্ছেন। গোটা জাতি শোকে মুহ্যমান।

ইরানের মন্ত্রিসভা ইমাম আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ীর শাহাদাতের পর ৪০ দিনের জাতীয় শোক এবং ৭ দিনের সরকারি ছুটির ঘোষণা করেছে।#


ইরানের সর্বোচ্চ নেতার শাহাদাতের খবর যেভাবে প্রকাশ করছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম

রোববার বিশ্বের গণমাধ্যম ব্যাপকভাবে ইরানের সবোর্চ্চ নেতা ইমাম খামেনেয়ীর শাহাদাতের খবর প্রচার করেছে।

পার্সটুডে জানিয়েছে, ব্রিটিশ সংবাদ সংস্থা রয়টার্স মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইহুদিবাদী ইসরায়েলের আক্রমণে ইসলামী বিপ্লবের নেতার শাহাদাতের কথা উল্লেখ করে একটি প্রতিবেদনে লিখেছে, ইমাম খামেনেয়ীর ৩৬ বছরের নেতৃত্ব ইরানকে একটি শক্তিশালী আমেরিকা-বিরোধী শক্তিতে পরিণত করেছে।

মার্কিন ন সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস  লিখেছে, ইসরায়েলি এবং মার্কিন আক্রমণে বিপ্লবের নেতা শহীদ হয়েছেন এবং এই আক্রমণগুলো ইরানে মার্কিন হস্তক্ষেপের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। গত আট মাসের মধ্যে এটি দ্বিতীয় ঘটনা, যখন ট্রাম্প প্রশাসন পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার সময় তেহরানে আক্রমণ করেছে।

ফরাসি সংবাদ সংস্থাও সবোর্চ্চ নেতার শাহাদাতের খবর প্রকাশের পর বিপ্লবের নেতাকে "পশ্চিমা উপনিবেশবাদীদের চরম শত্রু" হিসাবে বর্ণনা করেছে।

রুশ সংবাদ সংস্থা তাস, ইমাম খামেনেয়ীর শাহাদাতের বিষয়ে অসংখ্য সংবাদ প্রকাশ করে লিখেছে, ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি ইরানি নেতার শাহাদাতের প্রতিশোধ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

ফ্রান্স টুয়েন্টিফোর-ও একই বিষয়ে লিখেছে, বিপ্লবী গার্ডরা মার্কিন এবং ইসরায়েলি ঘাঁটির বিরুদ্ধে 'ইতিহাসের সবচেয়ে নৃশংস আক্রমণ পরিচালনা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

তুরস্কের আনাদোলু এজেন্সি লিখেছে, আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী শনিবার সকালে তার অফিসে শহীদ হন এবং এতে "বিশ্বের দাম্ভিক শক্তির বিরুদ্ধে এক মহান বিদ্রোহের" সূচনা হবে।

ওয়াশিংটন ডিসির আটলান্টিক কাউন্সিল থিঙ্ক ট্যাঙ্কের উপদেষ্টা হারলান উলমানের উদ্ধৃতি দিয়ে আল জাজিরা জানিয়েছে,  আমেরিকা আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ীকে শহীদ করে "বড় ভুল" করেছে।

রাশিয়ার রাশা টুডেও বিপ্লবী নেতার শাহাদাতকে তাদের সংবাদের শীর্ষে রেখেছে এবং ইরানের রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের একটি বিবৃতি উদ্ধৃত করে ঘোষণা করেছে, "এই "মারাত্মক অপরাধ" কখনও জবাবহীন থাকবে না এবং ইসলামী বিশ্ব ও শিয়া ধর্মের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।"

ব্রিটিশ পত্রিকা গার্ডিয়ান এবং চীনা সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, ইরান সরকার ৪০ দিনের শোক ঘোষণা করেছে।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক আগ্রাসনের নিন্দা জাতিসংঘের মহাসচিবের

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠকে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক ‌আগ্রাসনের নিন্দা জানিয়েছেন।

ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থার ইরনা জানিয়েছে, জাতিসংঘ সনদ আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার ভিত্তি প্রদান করে জানিয়ে আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, সনদের ২ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, “সব সদস্য রাষ্ট্র তাদের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো দেশের আঞ্চলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ বা তার হুমকি থেকে বিরত থাকবে।”

গুতেরেস বলেন, “আন্তর্জাতিক আইন এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইন সব সময় মেনে চলতে হবে। সেই কারণেই আজ সকাল থেকে আমি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাপক সামরিক হামলার নিন্দা করে আসছি। এছাড়াও, ইরানের পরবর্তী হামলাগুলোর (মার্কিন সামরিক ঘাঁটির বিরুদ্ধে), যা বাহরাইন, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা লঙ্ঘন করেছে, সেগুলোরও নিন্দা জানাই।”

জাতিসংঘের মহাসচিব আরও বলেন, “আমরা আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য একটি গুরুতর হুমকি প্রত্যক্ষ করছি। সামরিক পদক্ষেপ বিশ্বের সবচেয়ে অস্থিতিশীল অঞ্চলে ঘটনাবলীর এক শৃঙ্খল প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করার ঝুঁকি বহন করে, যা কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।”

তিনি জোর দিয়ে বলেন, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধানের কোনো কার্যকর বিকল্প নেই। স্থায়ী শান্তি কেবল শান্তিপূর্ণ উপায়ে, যার মধ্যে সংলাপ ও প্রকৃত আলোচনা অন্তর্ভুক্ত, অর্জন করা সম্ভব।

জাতিসংঘের মহাসচিব বলেন, তেহরান, ইস্ফাহান, কোম, শাহরিয়ার ও তাবরিজসহ ইরানজুড়ে প্রায় ২০টি শহরে হামলা হয়েছে। তেহরানে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ ও সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয় সংবলিত এলাকায় বড় বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। এসব হামলায় উল্লেখযোগ্য বেসামরিক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। ইরানি গণমাধ্যমের তথ্যমতে, হরমুজগান প্রদেশের মিনাবে মেয়েদের একটি স্কুলে বিমান হামলায় অন্তত ৮৫ জন নিহত এবং আরও অনেকে আহত হয়েছে। তেহরানের একটি স্কুলে আঘাত হানার ফলে দুইজন নিহত হয়েছে বলে জানা গেছে।

জাতিসংঘের মহাসচিব বলেন: সামরিক কার্যক্রম দ্রুত পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে এবং ক্রমবর্ধমানভাবে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে, যা ভুল হিসাবের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

গুতেরেস যোগ করেন: ইসরায়েলি সূত্র অনুযায়ী, ইসরায়েলের ওপর ইরানের পরবর্তী হামলায় আট থেকে নয়জন আহত হয়েছে এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরেও প্রভাব পড়েছে। ইরান ঘোষণা করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার জবাবে তারা অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।

জাতিসংঘের মহাসচিব আরও বলেন, প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই হামলাগুলো আমি আগে উল্লেখ করা দেশগুলোর বেসামরিক এলাকা ও অবকাঠামোর ক্ষতি করেছে। লেবানন ও সিরিয়াতেও পরোক্ষ প্রভাবের খবর পাওয়া গেছে।

গুতেরেস বলেন, অধিকাংশ উপসাগরীয় দেশ ইরানের হামলা প্রতিহত করেছে। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, প্রতিহত করা একটি ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষে একজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে। ইরাকে উভয় পক্ষের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর পাওয়া গেছে। আন্তর্জাতিক নৌপরিবহনের জন্য ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করেছে বলেও প্রতিবেদন রয়েছে।

জাতিসংঘের মহাসচিব জোর দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা ওমানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে তৃতীয় দফা পরোক্ষ আলোচনার পর ঘটেছে। আগামী সপ্তাহে ভিয়েনায় কারিগরি আলোচনার প্রস্তুতি এবং তার পর নতুন রাজনৈতিক আলোচনার পরিকল্পনা ছিল। আমি দুঃখিত যে, এই কূটনৈতিক সুযোগ হারিয়ে গেছে।

গুতেরেস বেসামরিক নাগরিক ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর বিস্তৃত সংঘাতের পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করে বলেন: আমি সকল পক্ষকে জোরালোভাবে আহ্বান জানাই যে তারা অবিলম্বে আলোচনার টেবিলে ফিরে আসুক, বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বিষয়ে।

তিনি উল্লেখ করেন: মার্কিন প্রেসিডেন্ট সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের সদস্য দেশসমূহ ও ইরাকের সমকক্ষদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন।

গুতেরেস তার বক্তব্যে সব সদস্য রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘ সনদ, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং পারমাণবিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার মেনে চলার আহ্বান জানান।