আর্কাইভ | ঢাকা, শনিবার, ০৩ জানুয়ারী ২০২৬, ২০ পৌষ ১৪৩২, ১৩ রজব ১৪৪৭ ১০:৫৩:৩১ পূর্বাহ্ন
Photo
স্টাফ রিপোর্টার
ঢাকা, প্রকাশিতঃ
৩১ ডিসেম্বর ২০২৫
০৭:১৯:৪৩ পূর্বাহ্ন

দেশে এমন জানাজা আগে দেখেনি কেউ


অনুষ্ঠিত হলো দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী সরকার প্রধান বেগম খালেদা জিয়ার নামাজে জানাজা।

এই জানাজায় জনসমুদ্র শব্দটিও যেন বিশালতার কাছে হার মেনেছে। কেননা যেদিকে চোখ যায়, সেদিকেই কেবল চোখে পড়েছে মানুষ। শোনা গেছে, লাখো কণ্ঠের কান্নাজড়িত দোয়া।


রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউ ছাপিয়ে জনস্রোত আছড়ে পড়েছে আশেপাশের কয়েক কিলোমিটার জুড়ে। যেদিকে চোখ যায়, শুধু মানুষ আর মানুষ। দলমত-নির্বিশেষে শোকার্ত মানুষের এই ঢল প্রমাণ করল, রাজনীতির ‘আপসহীন নেত্রী’ বেগম খালেদা জিয়া মানুষের হৃদয়ে কতটা গভীরে স্থান করে নিয়েছিলেন। প্রবীণ রাজনৈতিক বিশ্লেষক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ, সবাই একবাক্যে স্বীকার করছেন, ‘দেশে এমন জানাজা এর আগে আর দেখেনি কেউ।’

বুধবার বেলা ৩টায় যখন জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় বেগম জিয়ার জানাজা শুরু হয়, তখন ঢাকা মানিক মিয়া এভিনিউয়ের আশেপাশের সড়কগুলো কার্যত স্থবির। জানাজাস্থল মানিক মিয়া এভিনিউ পূর্ণ হয়ে সেই ভিড় ছড়িয়ে পড়েছিল উত্তরে জাহাঙ্গীর গেট, পশ্চিমে মিরপুর রোড এবং পূর্বে ফার্মগেট পেরিয়ে কারওয়ান বাজার, বাংলামোটর ও মগবাজার পর্যন্ত। মাইকের আওয়াজ যতদূর পৌঁছায়, মানুষ ততদূরেই রাস্তায় কাতারবন্দী হয়ে দাঁড়িয়েছেন। অনেকের চোখের কোণে জল, কেউবা হাত তুলে নীরবে দোয়া করছেন।

এর আগে, শীত উপেক্ষা করে গতকাল মঙ্গলবার রাত থেকেই মানুষ মানিক মিয়া এভিনিউ, দলীয় কার্যালয়, এভারকেয়ারসহ বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়েছিলেন। আজ বেলা বাড়ার সাথে সাথে মানুষের ঢল রুপ নেয় এক বিশাল জনসমুদ্রে।

জানাজায় অংশ নিতে আসা পুরান ঢাকার সত্তরোর্ধ্ব ব্যবসায়ী হাজী আবদুল লতিফ বলেন, ‘১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জানাজা দেখেছিলাম। ভেবেছিলাম, বাংলাদেশে আর হয়তো এমন দৃশ্য দেখব না। আজ ৪৪ বছর পর তার স্ত্রীর জানাজায় এসে মনে হচ্ছে, ইতিহাস আবার ফিরে এসেছে! এমন ভালোবাসা জোর করে আদায় করা যায় ন। এটা আল্লাহ প্রদত্ত বিষয়। তিনি যাকে সম্মান দেন, কেউ তাকে অসম্মান করতে পারে না।’

শুধু দলীয় নেতাকর্মী নন, জানাজায় অংশ নিয়েছেন সাধারণ চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী, রিকশাচালক থেকে শুরু করে দেশের সর্বস্তরের মানুষ। ভিড়ের চাপে সংসদ ভবনের আশপাশের গাছ, ফুটপাত, এমনকি নিকটস্থ ভবনগুলোর ছাদও ছিল লোকে লোকারণ্য। জানাজার ঠিক আগমুহূর্তে খালেদা জিয়াকে নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের কান্নাবিজড়িত বক্তৃতার পর যখন তারেক রহমান তার মায়ের জন্য দোয়া চাইলেন, পিনপতন নীরবতায় তখন পুরো এলাকা যেন দেশনেত্রীর বিরহ-বেদনায় ভার হয়ে ওঠে।জীবনীমূলক বই

বেগম জিয়ার এই শেষ বিদায়ে উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিরা। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত, পাকিস্তান, জাপান, সৌদি আরবসহ ঢাকাস্থ ৩২টি দেশের কূটনীতিক ও প্রতিনিধিরা জানাজায় অংশ নেন। যার মধ্যে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, ভূটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পাকিস্তানের স্পিকার উপস্থিত ছিলেন। বিদেশী কূটনীতিকদের জন্য নির্ধারিত স্থানে দাঁড়িয়ে তারা এ সময় প্রত্যক্ষ করেন বাংলাদেশের মানুষের এই আবেগঘন বিদায় মুহূর্ত!

বেগম জিয়ার জানাজায় নারীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। জানাজাস্থলের মূল অংশে নারীদের প্রবেশাধিকার সীমিত থাকলেও আশপাশের নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে হাজারো নারী অশ্রুসজল চোখে বিদায় জানিয়েছেন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীকে। তাদের অনেকের হাতে ছিল কালো ব্যাজ, মুখে ছিল শোকের ছায়া।

বিশ্লেষকদের মতে, বেগম খালেদা জিয়ার এই জানাজা কেবল একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা ছিল না, এটি ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অন্যতম বড় ঘটনা!বাংলাদেশ ভ্রমণ

দীর্ঘ রোগভোগ, কারাবাস আর নানা চড়াই-উৎরাইয়ের পর তার এই বিদায় প্রমাণ করে, ক্ষমতার বাইরে থেকেও একজন নেতা কিভাবে গণমানুষের মনে বেঁচে থাকতে পারেন।


খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ‘ফ্যাসিবাদী হাসিনা’ কখনো দায়মুক্ত হতে পারে না: নজরুল ইসলাম
গৃহবন্দী থাকাকালে বিদেশে চিকিৎসা নিতে না দেয়ার কারণে অসুস্থতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলশ্রুতিতে অবশেষে তাকে মৃত্যুর কাছে হার মানতে হলো। তাই এই মৃত্যুর দায় থেকে ফ্যাসিবাদী হাসিনা কখনো মুক্তি পেতে পারে না।


বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ‘ফ্যাসিবাদী হাসিনা’ কখনো দায়মুক্ত হতে পারে না বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান।


দুপুরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জানাজার আগে তার জীবন ও কর্ম সবার উদ্দেশে তুলে ধরার সময় এমন মন্তব্য করেন তিনি।


নজরুল ইসলাম খান, দল-মত নির্বিশেষে সমগ্র দেশবাসীর ভালোবাসা নিয়ে বিদায় নিচ্ছেন বেগম খালেদা জিয়া। পেছনে রেখে গেলেন এক মহীয়সী নারী, এক সংগ্রামী রাজনীতিবিদ, এক দেশপ্রেমিক রাষ্ট্রনায়কের অনন্য উদাহরণ।

তিনি আরো বলেন, দু’বছরেরও বেশি সময় অন্ধকার কারাগারে আবদ্ধ থাকায় উপযুক্ত চিকিৎসার অভাবে তিনি দারুণ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। সমগ্র দেশবাসী এর সাক্ষী। পায়ে হেঁটে তিনি কারাগারে প্রবেশ করেছিলেন। কিন্তু নির্জন কারাগার থেকে তিনি বের হলেন চরম অসুস্থতা নিয়ে। দেশ-বিদেশের চিকিৎসকদের মতে, পরবর্তীতে গৃহবন্দী থাকাকালে বিদেশে চিকিৎসা নিতে না দেয়ার কারণে অসুস্থতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলশ্রুতিতে অবশেষে তাকে মৃত্যুর কাছে হার মানতে হলো। তাই এই মৃত্যুর দায় থেকে ফ্যাসিবাদী হাসিনা কখনো মুক্তি পেতে পারে না।

উল্লেখ্য, লাখো মানুষের অংশগ্রহণে সম্পন্ন হয়েছে বেগম জিয়ার জানাজা। জানাজা পড়ান জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতীব মুফতি আবদুল মালেক।

জাতীয় সংসদ ভবনের মাঠ ও সংলগ্ন মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে তার জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হয়েছে। দেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম এই জানাজায় অংশ নিতে আসা মানুষের ভিড় সংসদ ভবন এলাকা ছাড়িয়ে কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে এক মহাসমুদ্রে রূপ নেয়। সেখানে ও আশপাশের সব রাস্তাজুড়ে সমবেত হয়েছেন দেশের দূর-দূরান্ত থেকে আসা বিএনপি নেতা, কর্মী, সমর্থকসহ বিপুল সংখ্যক মানুষ।

এছাড়া বিভিন্ন দূতাবাসের কূটনীতিক ও বিদেশী অতিথিরাও অংশ নিয়েছেন। দেশের নেতাদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ জানাজায় শরিক হন। জানাজায় নারীদের অংশগ্রহণের জন্যও বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।