গাজায় ইহুদিবাদী ইসরাইলের আগ্রাসন পুনরায় শুরু হওয়ার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। তিনি বলেন, এ আগ্রাসন অত্যন্ত বড় ধরনের অপরাধ ও বিপর্যয়কর। মুসলিম উম্মাহকে সব মতভেদ ভুলে এ অপরাধের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়ানোর আহবান জানান তিনি।
ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থা ইরনার উদ্ধৃতি দিয়ে তেহরান থেকে এএফপি শুক্রবার এ খবর জানায়।
আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বলেছেন, এটি পুরো মুসলিম উম্মাহর সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়। ইউরোপ ও আমেরিকাসহ বিশ্বের সব অঞ্চলের মুক্তিকামী মানুষকে এ বিশ্বাসঘাতকতামূলক ও বিপর্যয়কর পদক্ষেপ মোকাবেলা করতে হবে। যাতে আবারও শিশু-হত্যা, ঘরবাড়ি ধ্বংস ও ফিলিস্তিনি জনগণকে শরণার্থী হতে না হয়।
তিনি বলেন, মার্কিন সরকার এ বিপর্যয়ের দায়-দায়িত্বের শরিক। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মার্কিন সরকারের ইশারায় অথবা তাদের সম্মতিতে এ অপরাধযজ্ঞ চালিয়েছে ইসরাইল।
তিনি বলেন, ইয়েমেনের ওপর ও দেশটির বেসামরিক জনগণের ওপর হামলা আরও এক অপরাধযজ্ঞ, যা অবশ্যই ঠেকাতে হবে।
খামেনি বলেন, লেবানন ও ফিলিস্তিনি জাতির নানা সংকট মোকাবিলার ক্ষেত্রেও ইরানি জাতি উদার চিত্তে তাদের সাহায্য করেছে। লেবাননি ও ফিলিস্তিনি ভাইবোনদের সহায়তায় জোয়ারের মতো বিপুল পরিমাণ সাহায্য পৌঁছে দিয়েছে। এর মধ্য দিয়েও ইরানি জাতির উচ্চতর মনোবল ও আধ্যাত্মিক শক্তি ফুটে উঠেছে।
এ প্রসঙ্গে খামেনি উল্লেখ করেন, প্রতিরোধ আন্দোলনের প্রতি ইরানি জনগণের বিস্ময়কর সহায়তা, বিশেষ করে ইরানি নারীদের স্বর্ণালংকার উপহার দেওয়ার ঘটনা ইরানের ইতিহাসের অবিস্মরণীয় ঘটনা।
ইসরায়েলে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে হাজারো মানুষের বিক্ষোভ
গাজা উপত্যকায় নতুন যুদ্ধবিরতির দাবিতে ইসরায়েলের রাস্তায় নেমে হাজার হাজার ইসরায়েলি নাগরিক বিক্ষোভ করেছেন। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী সরকারের বিরুদ্ধেও বিক্ষোভ করেছেন তাঁরা। বিক্ষোভকারীদের দাবি, নেতানিয়াহু সরকার দেশের গণতন্ত্রকে আঘাত করেছে।
বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। জেরুজালেম ও তেল আবিব থেকে পুলিশ কমপক্ষে ১২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। আয়োজকেরা বলছেন, বিক্ষোভ কর্মসূচি যেভাবে গতি পাচ্ছে, তাতে আগামী দিনগুলোতে আরও বেশি বিক্ষোভ হতে পারে।
ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থার প্রধান রোনেন বারকে বরখাস্ত করার জন্য নেতানিয়াহুর প্রচেষ্টাকে কেন্দ্র করে এ বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। তবে গাজায় প্রাণঘাতী বিমান হামলা চালিয়ে দুই মাসের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের পর নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ জোরালো হয়ে ওঠে।
যুদ্ধবিরতি অব্যাহত রাখতে বিদেশি সরকারগুলোর আহ্বান উপেক্ষা করে সম্প্রতি আকাশ ও স্থলপথে হামলা জোরদার করেছে ইসরায়েল। এর মধ্য দিয়ে গত জানুয়ারিতে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি ভেস্তে গেছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল–জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, গাজায় গত কয়েক দিনে ইসরায়েলের হামলায় প্রায় ৬০০ মানুষ নিহত হয়েছেন।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, সরকার রাজনৈতিক কারণে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে এবং গাজায় এখনো হামাসের কাছে জিম্মি থাকা ৫৯ জনের পরিণতি নিয়ে ভাবছে না। ধারণা করা হচ্ছে, জিম্মিদের মধ্যে ২৪ জন জীবিত আছেন।
ব্রাদার্স ইন আর্মস আন্দোলনের প্রধান নির্বাহী ইতান হার্জেল বলেন, ‘এই সরকার এখন নিজেকে রক্ষা করার জন্য, ইসরায়েলের জনসাধারণকে বিরক্ত করবে, এমন বিষয়গুলো থেকে নজর অন্যদিকে সরানোর জন্য আবারও যুদ্ধ শুরু করেছে। সরকার সম্ভাব্য সব পর্যায়ে সব ধরনের বৈধতা হারিয়েছে। তারা ব্যর্থ হচ্ছে।’
গত বুধবার হাজার হাজার মানুষ জেরুজালেমের মধ্যাঞ্চলে নেতানিয়াহুর সরকারি বাসভবনের কাছের সড়কগুলোতে অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁদের অনেকের হাতে ছিল পতাকা এবং গাজায় এখনো জিম্মি থাকা মানুষদের সমর্থনে লেখা স্লোগানসংবলিত প্ল্যাকার্ড। অনেকে ড্রাম বাজাচ্ছিলেন এবং স্লোগান দিচ্ছিলেন, ‘এখনই জিম্মি মুক্তির চুক্তি করুন।’
বিক্ষোভের আয়োজকদের একজন ওরা নাকাশ পেলেড। তিনি নৌবাহিনীর সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। তিনি হাইফা শহরের নিকটবর্তী একটি এলাকা থেকে বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন। জেরুজালেমের উপকণ্ঠে তাঁবুর ভেতর অন্য বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে তিনি রাত কাটিয়েছেন। পরে পায়ে হেঁটে শহরটির ভেতর ঢুকে গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়কে বিক্ষোভ করেন।
নাকাশ পেলেড বলেন, ‘আমি মনে করি, আমরা আমাদের বক্তব্য তুলে ধরতে পেরেছি। আমাদের সংগঠিত হতে হবে, আমাদের অবিচল থাকতে হবে, আমাদের মূল লক্ষ্যে নিবদ্ধ থাকতে হবে। (বিক্ষোভ) সহিংস হওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি এটিকে ভদ্রোচিতও রাখা যায় না।’
বিক্ষোভকারীরা জোরালো কণ্ঠে বলছিলেন, ‘ইসরায়েল তুরস্ক নয়, ইসরায়েল ইরান নয়।’ নেতানিয়াহুর নেওয়া বেশ কিছু সাম্প্রতিক পদক্ষেপকে ইসরায়েলি গণতন্ত্রের জন্য ‘লাল পতাকা’ বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। এর একটি হলো, বারকে বরখাস্ত করার তৎপরতা। আরেকটি হলো, অ্যাটর্নি জেনারেল গ্যালি বাহারাভ মিয়ারাকে বরখাস্ত করার তৎপরতা। মিয়ারা যুক্তি দেখিয়েছেন, বারকে তাঁর পদ থেকে উৎখাত করা হলে তা অবৈধ হতে পারে।
ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের আইনবিশেষজ্ঞ আমির ফুচস বলেন,‘সরকারের বারকে বরখাস্ত করার এখতিয়ার আছে। তবে এরপরও প্রশাসনিক আইন মেনে চলতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, যদি স্বার্থের সংঘাত দেখা দেয়, তবে সুপ্রিম কোর্ট এটাকে আটকাতে পারে।’
জাতীয় নিরাপত্তা লঙ্ঘনের অভিযোগে নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের বিরুদ্ধে তদন্ত করছে নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিন বেতের বিস্তৃত ক্ষমতা রয়েছে। স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, বুধবার ইসরায়েলি পুলিশ ‘কাতারগেট’ মামলায় নতুন সন্দেহভাজনদের সাক্ষাৎকার নিয়েছে।
এদিকে চলমান দুর্নীতির বিচার শেষে নেতানিয়াহুরও কারাদণ্ড হতে পারে। ৭৫ বছর বয়সী এই রাজনীতিবিদ ১৯৯৬ সালে প্রথমবারের মতো ইসরায়েলে ক্ষমতা গ্রহণ করেছিলেন এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৭ বছর দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি এখন সপ্তাহে দুবার করে আদালতে হাজিরা দিচ্ছেন।
যেসব ভুলত্রুটির কারণে ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলে হামাসের হামলা হলো, তার জন্য দায়ী বলে বিবেচিত বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ইতিমধ্যে পদত্যাগ করেছেন। নেতানিয়াহু নিজে ইসরায়েলের সবচেয়ে ভয়াবহ নিরাপত্তা বিপর্যয়ের এ ঘটনায় কোনো দায় স্বীকার করেননি। ইসরায়েলে হামাসের ওই হামলায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হয়েছিলেন। তাঁদের বেশির ভাগই বেসামরিক নাগরিক। এ ঘটনায় একটি শক্তিশালী তদন্ত কমিশন গঠনের আহ্বান জানানো হলেও নেতানিয়াহু তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ‘পূর্ণ সমর্থন’ ট্রাম্পের: হোয়াইট হাউস
ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় নারকীয় তাণ্ডব চালাচ্ছে ইসরায়েল। গত কয়েকদিনে ভূখণ্ডটিতে ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন প্রায় ৭০০ ফিলিস্তিনি।
বর্বর এই আগ্রাসনের জেরে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে বাড়ছে ক্ষোভ। তবে এই পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের পাশেই দাঁড়িয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ‘পূর্ণ সমর্থন’ আছে ট্রাম্পের। একইসঙ্গে গাজায় চলমান গণহত্যার জন্য হামাসকে অভিযুক্ত করেছে ওয়াশিংটন। শুক্রবার (২১ মার্চ) এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিভিট বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গাজায় ইসরায়েলের বিমান ও স্থল আক্রমণ পুনরায় শুরু করার বিষয়টিকে “পূর্ণ সমর্থন” করেন। এছাড়া গত মঙ্গলবার থেকে ইসরায়েল কর্তৃক ফিলিস্তিনিদের গণহত্যার জন্য হামাসকে দায়ী করেছেন তিনি।
ট্রাম্প গাজায় যুদ্ধবিরতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন কিনা সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে লিভিট বলেন, “তিনি ইসরায়েল ও আইডিএফ (ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী) এবং সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তাদের গৃহীত পদক্ষেপগুলোকে সম্পূর্ণ সমর্থন করেন।”
চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি থেকে গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও ইসরায়েল তা একতরফাভাবে লঙ্ঘন করে এবং গত মঙ্গলবার থেকে অবরুদ্ধ এই ভূখণ্ডটিতে প্রায় ৭০০ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে। যার মধ্যে ২০০ শিশুও রয়েছে এবং আহত হয়েছেন আরও ১০৪২ জন।
এছাড়া বৃহস্পতিবার গাজায় ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে কমপক্ষে ১১০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে অনেকেই নারী ও শিশু রয়েছে। কিন্তু ফিলিস্তিনের এই ভূখণ্ডে রক্তপাতের জন্য হামাসকে দায়ী করেছেন লিভিট।
হোয়াইট হাউসের এই প্রেস সেক্রেটারি বলেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হামাসকে স্পষ্ট করে বলেছেন— যদি তারা সমস্ত জিম্মিকে মুক্তি না দেয় তবে তাদের চড়া মূল্য দিতে হবে এবং দুর্ভাগ্যবশত, হামাস গণমাধ্যমে জীবন নিয়ে খেলা করাকেই বেছে নিয়েছে।”
লিভিট আরও বলেন, এই পরিস্থিতিতে “সম্পূর্ণরূপে দোষ হামাসের”। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চান— ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের হাতে বন্দি “সকল জিম্মিকে” মুক্তি দেওয়া হোক।
এদিকে বৃহস্পতিবারের রক্তাক্ত ঘটনার বিষয়ে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উত্তরাঞ্চলের জরুরি পরিষেবার প্রধান ফারেস আওয়াদ বলেন, “বেইত লাহিয়ার জনগণের জন্য এটি ছিল এক রক্তাক্ত রাত। উদ্ধারকারীরা এখনও ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িগুলোর ধ্বংসস্তূপে অনুসন্ধান চালাচ্ছেন। পরিস্থিতি ভয়াবহ।”