আর্কাইভ | ঢাকা, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫ আশ্বিন ১৪৩৩, ৬ রবিউস সানি ১৪৪৮ ১১:২৮:০৮ অপরাহ্ন
Photo
আন্তর্জাতিক ডেস্ক 
ঢাকা, প্রকাশিতঃ
২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
০৫:৫২:২১ পূর্বাহ্ন

আই ফোন নিয়ে বাইরে যেতে নিষেধ করেছিলেন বাবা 


কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম ও কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম। শুক্রবার বিকেলে বাসা থেকে বের হয়েছিল বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে। আর ফিরল পরদিন, নিথর হয়ে।

১৮ সেপ্টেম্বর বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে কোটবাড়ির বাসা থেকে বের হওয়ার সময় অপ্রতিমের সঙ্গে ছিল তার মায়ের আই ফোন। যাওয়ার আগে বাবা তাকে বাইরে যেতে নিষেধ করেছিলেন। বলেছিলেন, বাইরে যাওয়ার দরকার নেই। দুজনে মিলে সিনেমা দেখবেন। ছেলের জন্য একটি উপহারও কিনে রেখেছিলেন তিনি।


অপ্রতিম অবশ্য বেরিয়ে গেল। তার বয়সী একটি ছেলে যেভাবে বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতে চায়, সেভাবেই হয়তো সেদিনও তার মনে হয়েছিল একটু বাইরে যাবে, ছবি তুলবে, তারপর ফিরে আসবে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হবে, সন্ধ্যা পেরিয়ে সে বাসায় ঢুকবে। বাবা-মায়ের সঙ্গে আবার কথা হবে। সেদিনের গল্প সেখানেই শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অপ্রতিম আর বাসায় ফেরেনি।

সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হলো। রাত পেরিয়ে ভোর। পরিবারের মানুষজন তখন তাকে খুঁজছেন। আত্মীয়-স্বজন, পরিচিতজন, শিক্ষক, আশপাশের মানুষ, যে যেভাবে পারছেন; খোঁজ করছেন। সিসিটিভি ফুটেজ দেখা হচ্ছে, ফোনের অবস্থান জানার চেষ্টা চলছে। কোথায় গেল ছেলেটি, কী হয়েছে তার সঙ্গে, এই প্রশ্নের উত্তর মিলছিল না।


একজন বাবা-মায়ের কাছে সন্তানের নিখোঁজ হওয়ার পর প্রতিটি মিনিট কতটা দীর্ঘ হয়, সেটা বাইরে থেকে বোঝা কঠিন। ফোন বেজে উঠলেই মনে হয়, এবার হয়তো ছেলের খবর এসেছে। অপরিচিত কোনো নম্বর থেকে কল এলে বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। কেউ হয়তো বলবে, অপ্রতিমকে পাওয়া গেছে। এই অপেক্ষার মধ্যেই রাত কেটে যায়।

প্রায় ২১ ঘণ্টা পর শনিবার কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ও লালমাই পাহাড়ের কাছাকাছি একটি নির্জন জায়গা থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তার মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল। খবরে আমরা লিখি, ‘অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার’। একটি সংবাদ প্রতিবেদনে এই বাক্যটাই স্বাভাবিক। কিন্তু একজন বাবার কাছে বিষয়টি এতটা সরল নয়। কয়েক ঘণ্টা আগেও যাকে নিজের হাতে খাইয়েছেন, বাইরে যেতে নিষেধ করেছেন, যার জন্য একটি উপহার রেখে দিয়েছেন, সেই ছেলেটির মরদেহ যখন সামনে আসে; তখন সংবাদপত্রের কোনো শব্দ দিয়ে সেই মুহূর্তটা বোঝানো যায় না।


অপ্রতিমকে কী কারণে হত্যা, জানাল পুলিশ

কুমিল্লায় অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড সারাদেশ নাড়িয়ে দিয়েছে। ১৩ বছর বয়সি এই কিশোরকে কেন এভাবে নৃশংসভাবে হত্যা করা হলো, সেই রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। অপ্রতিমের হাতে থাকা আইফোনটি ছিনিয়ে নিতেই তাকে মেরে ফেলা হয় বলে জানানো হয়েছে। 

রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) দুপুর সোয়া ২টার দিকে সংবাদ সম্মেলনে এমন তথ্যই জানিয়েছেন কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান।


তিনি জানিয়েছেন, অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে এখন পর্যন্ত তুহিন, ফাহাদ, কামরুল এবং সিয়াম নামে চার যুবককে আটক করা হয়েছে। তারা সবাই হত্যার দায় স্বীকার করেছেন।

পুলিশ সুপার বলেন, তদন্তের অংশ হিসেবে ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে প্রাথমিকভাবে আমরা নিশ্চিত হই যে, গত ১৮ সেপ্টেম্বর আনুমানিক দুপুর ২টা থেকে সোয়া ২টার মধ্যে তুহিন অপ্রতিমকে সঙ্গে নিয়ে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা নামক স্থানে চারপাশে পাহাড়ঘেরা নির্জন জঙ্গলের ভিতরে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর আমরা সিসিটিভি ফুটেজ দেখি এবং পর্যালোচনা করি। এতে অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা তুহিনকে এই মৃত্যুসংবাদ প্রাপ্তির পূর্বেই আমরা হেফাজতে নিই।

তিনি আরও বলেন, একটানা জিজ্ঞাসাবাদে তুহিন আমাদের কাছে স্বীকার করে যে, অপ্রতিমের মোবাইল আইফোনটি ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই পরিকল্পনা করে সে তাকে উক্ত নির্জন ঘটনাস্থলে নিয়ে যায়। তুহিন আরও জানায়, এই ঘটনায় ফাহাদ এবং ফাহাদের এক বন্ধু জড়িত ছিল। তার স্বীকারোক্তি মোতাবেক আমরা তাৎক্ষণিকভাবে অভিযান পরিচালনা করি এবং ফাহাদকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করি। জিজ্ঞাসাবাদে ফাহাদ জানায়, এই হত্যাকাণ্ডের সাথে তার আরেক বন্ধু কামরুল জড়িত। ফাহাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আমরা তাকে হেফাজতে নিই।


আইফোন উদ্ধার প্রসঙ্গে পুলিশ সুপার বলেন, তুহিনের দেওয়া তথ্য ও দেখানো মতে আমরা প্রথমে আইফোনটির জন্য তিন জায়গায় অভিযান পরিচালনা করি। সে মিসগাইড করেছিল, কোথাও পাওয়া যায়নি। অবশেষে তার স্বীকারোক্তি এবং তার দেখানো মতে তার বাসার ভিতরে অভিযান পরিচালনা করে তার তোশকের নিচ থেকে আইফোনটি আমরা উদ্ধার করতে সক্ষম হই।

হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দিয়ে পুলিশ সুপার বলেন, প্রাথমিকভাবে আমরা জানতে পেরেছি যে, ঘটনার দিন বিকেল ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে সানন্দা নামক স্থানে চারপাশে পাহাড়ঘেরা নির্জন বনের ভেতরে অপ্রতিমের যে আইফোনটি ছিল সেটি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে অপ্রতিম বাধা দেয়। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়। তখন ফাহাদ ও কামরুল বাঁশের শক্ত লাঠি দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় উপর্যুপরি আঘাত করে। এক পর্যায়ে অপ্রতিমের মৃত্যু নিশ্চিত হলে আইফোনটি নিয়ে পালিয়ে যায়।

আরও পড়ুন: অপ্রতিম নিখোঁজের পর কী ঘটেছিল, যা জানা যাচ্ছে
তিনি বলেন, আমরা সিয়াম নামে আরেকজনকে আটক করেছি। তার বিরুদ্ধে প্রাপ্ত তথ্য যাচাই-বাছাই করছি। আমরা ইতোমধ্যে ঘটনার সঙ্গে জড়িত তুহিন, ফাহাদ ও কামরুলকে এই হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করেছি। ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যান্য বিষয় এবং অন্য কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত চলমান রেখেছি।

বিচার প্রসঙ্গে পুলিশ সুপার বলেন, হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুতই পুলিশ প্রতিবেদন বা চার্জশিট বিজ্ঞ আদালতে দাখিল করা হবে। রামিসা হত্যার মামলায় যেমন দ্রুত রায় এসেছে, এই মামলাটির জন্যও দ্রুত আমরা বিজ্ঞ আদালতের কাছে আবেদন রাখবো। 

নিহত অপ্রতিম ও আসামি তুহিনের বয়স প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই, তার (অপ্রতিম) বয়স ১৩, আর আসামি সাইফুল ইসলাম তুহিন, তার বয়স ১৯। সে কুমিল্লা সিটি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ফেল করে ২০২৫ সালে ড্রপআউট হয়।

পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, ‘আমরা ঘটনার মূল রহস্য উদ্ঘাটন করেছি, মূল আসামিকে গ্রেফতার করেছি এবং যে আইফোনটির কারণে হত্যাকাণ্ড, সেই আইফোনটিও আমরা আসামির দেখানো মতে তার বাসা থেকে উদ্ধার করেছি। আমরা বাকি তদন্ত কাজ শেষ করে দ্রুত বিজ্ঞ আদালতে এই মামলার পুলিশ প্রতিবেদন দাখিল করব।’

এর আগে গত শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকা থেকে ১৩ বছর বয়সি কিশোর অপ্রতিম নিখোঁজ হয়। পরদিন (শনিবার) বেলা ১১টার পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন সামাজিক বনায়ন এলাকা থেকে তার মরদেহ করে পুলিশ।

নিহত অপ্রতিম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান। প্রিয় সন্তানকে হারিয়ে বর্তমানে পাগলপ্রায় ওই কিশোরের মা-বাবা।