আর্কাইভ | ঢাকা, সোমবার, ০৪ মে ২০২৬, ২১ বৈশাখ ১৪৩৩, ১৬ জিলক্বদ ১৪৪৭ ০৫:২২:২৮ অপরাহ্ন
Photo
বিশেষ প্রতিবেদক
ঢাকা, প্রকাশিতঃ
০৪ মে ২০২৬
১১:৪৯:১৫ পূর্বাহ্ন
আপডেটঃ
০৪ মে ২০২৬
১১:৫০:১৩ পূর্বাহ্ন

বিএনপি সরকার গঠনের পর চীনে প্রথম সফর নিয়ে কৌতুহল


পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আসন্ন চীন সফরে চীনের সাথে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও বাণিজ্য বৃদ্ধির উপায় নিয়ে আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে । যেহেতু বাংলাদেশের অনুরোধে চীন তিস্তা মহাপরিকল্পনায় বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছিল। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়েন ইর সাথে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক আগামী ৬ মে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত হবে। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এটা চীনে উচ্চপর্যায়ের প্রথম সফর। এই সফরে চীনের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় তিস্তার মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, অন্যান্য প্রকল্প হাতে নেয়ার সম্ভাবনা এবং দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনার উপায় নিয়ে আলোচনা হবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর চীন সফরটি হবে ৫ থেকে ৭ মে। 

চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইয়ের আমন্ত্রণে এই সফরে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীসহ সরকারের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হবেন। বিডা চীনে একটি কার্যালয় খোলার পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান আগামী ৫ মে দুপুরে দ্বিপক্ষীয় সফরের উদ্দেশ্যে চীনের বেইজিং যাচ্ছেন বলে দেশের একটি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছে ঢাকায় চীনা দূতাবাস ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক নির্ভরযোগ্য সূত্র। 

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, আগামী ৬ মে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। তবে বাংলাদেশ ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের আসন্ন বৈঠক মূলত ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করার একটি সুযোগ।

কূটনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশের অনুরোধে চীন তিস্তা মহাপরিকল্পনায় বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছিল। এ ব্যাপারে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পের পরিকল্পনা, যার মূল লক্ষ্য হলো তিস্তা নদী অববাহিকার টেকসই ব্যবস্থাপনা। এই মহাপরিকল্পনার আওতায় কৃষি, সেচ, পানি সংরক্ষণ, নদীশাসন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার মতো বিভিন্ন খাতে ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে উত্তরবঙ্গের দীর্ঘদিনের পানিসঙ্কট নিরসন হবে বলে আশা করা হচ্ছে।বাংলাদেশ সংবাদ কভারেজ

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস গত বছর এপ্রিলে বেইজিং সফরের সময় চীনকে তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানান। এর ভিত্তিতে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) মাধ্যমে চীনের কাছে প্রকল্পের অর্থায়ন প্রস্তাব পাঠিয়েছে। প্রকল্পের প্রথম পর্যায় (ফেইজ-১) বাস্তবায়নে প্রায় ৭৫ কোটি ডলারের প্রয়োজন, যার মধ্যে ৫৫ কোটি ডলার চীন থেকে ঋণের মাধ্যমে নেয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এ সফরে কোনো সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) বা আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে না; বরং দুই পক্ষ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অবস্থা পর্যালোচনা করবে এবং ভবিষ্যতে সহযোগিতা আরও গভীর করার পথ খুঁজবে। সূত্রটি বলেছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরে বিগত বছরগুলোতে চীনের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বিভিন্ন চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকের বাস্তবায়ন নিয়ে নিশ্চয়তা চাইবে চীন। বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে, তা এগিয়ে নিতে এ দেশে বিনিয়োগ বাড়াতে আগ্রহ রয়েছে দেশটির। এ ছাড়া তিস্তা চুক্তি, মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন, বহুপক্ষীয় ফোরামে সমন্বয়, রোহিঙ্গা ইস্যুসহ নানা দ্বিপক্ষীয় আলোচনা হবে।

বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবার চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখা বাংলাদেশের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের বাধায় যেন দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর রাখতে হবে। ফলে দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে বহুমুখী ইস্যু উত্থাপন করা হবে। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পর্যালোচনা ও উচ্চপর্যায়ের সফর (প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর) নিয়ে আলোচনা করা হবে। এ ছাড়া বর্তমানে নানা কারণে যেহেতু চীনের সঙ্গে বাণিজ্য কমছে, ফলে বাংলাদেশ চীনের কাছে স্পষ্টভাবে বার্তা দেবে যে, নতুন সরকার চীনা বিনিয়োগ আরও বাড়াতে চায়। বিশেষ করে গার্মেন্টস, ইলেকট্রনিক্স, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, অর্থনৈতিক অঞ্চল, অবকাঠামো ও শিল্পায়ন খাতে চীন আরও বিনিয়োগ করুক-এমন প্রত্যাশা করা হবে। ঢাকার পক্ষ থেকে উন্নয়ন সহযোগিতা ও বিআরআই প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হবে।

সূত্রে আরও জানাযায়, বাংলাদেশ চায় চীনের সঙ্গে যেসব প্রকল্প এখনো বাস্তবায়ন হয়নি, তা দ্রুত শেষ হোক এবং ভবিষ্যতে যেন ঋণের শর্ত আরও সহজ হয়। এ ছাড়া অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, শিল্পায়ন, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং নীলফামারীতে প্রস্তাবিত চীনের বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ, চীনা কোম্পানিগুলোকে গার্মেন্টস, ইলেকট্রনিক্স ও নতুন জ্বালানি খাতে আকৃষ্ট করা, বাংলাদেশ থেকে চীনে আরও কৃষিপণ্য রপ্তানি, স্বাস্থ্য, কৃষি, পশুসম্পদ, মৎস্য, রেলওয়ে, শিপিং, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, আইটি ও ডিজিটাল খাতে সহযোগিতা, আকাশ, স্থল ও সমুদ্রগণে যোগাযোগ বৃদ্ধি, বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব এবং চট্টগ্রাম-মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন ও তিস্তা প্রকল্পে চীনা সহযোগিতা চাওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। এছাড়া জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের প্রেসিডেন্সির জন্য বাংলাদেশের প্রার্থিতায় চীনের সমর্থন চাইবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। ব্রিকস, আরসিইপি ও এসসিও-তে যোগদানে সহায়তা এবং সার্কের আওতায় আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়েও আলোচনার কথা রয়েছে। বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকদের (রোহিঙ্গা) প্রত্যাবাসন বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর ইস্যু। চীন মিয়ানমারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখায়, চীনের মধ্যস্থতায় প্রত্যাবাসন ত্বরান্বিত করার বিষয়টিও উত্থাপন করবে ঢাকা।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফরে তুরষ্ক গিয়েছিলেন। এতে অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় ইস্যুর পাশাপাশি জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে বাংলাদেশের প্রার্থিতার পক্ষে সমর্থন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দ্বিতীয় সফরে তিনি ভারত গিয়েছেন। এই সফরে ভিসা সহজীকরণ, গণ-অভ্যুত্থানের পর ভারতে আশ্রয় নেয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ইনকিলাব মঞ্চের নেতা ওসমান হাদির হত্যায় জড়িত ও ভারতে গ্রেফতারকৃত দুই আসামিকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণ এবং জ্বালানি সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এটিকে ‘শুভেচ্ছা সফর’ বলা হলে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ‘সরকারি সফর’ হিসেবেই গণ্য করেছে। আর তৃতীয় সফরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী যাচ্ছেন চীন।বাংলাদেশ সংবাদ কভারেজ

চীন-বাংলাদেশের সম্পর্কের বিষয়ে বিশেষজ্ঞ শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিকাল স্টাডিজ বিভাগের প্রফেসর ড. মো: নজরুল ইসলাম বলেন, ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে বেইজিং। আমাদের নিজের দেশের স্বার্থে চীনের সাথে সুসম্পর্ক বৃদ্ধি করা জরুরি। তাই আমার মনে হচ্ছে বিনিয়োগের নিরাপত্তা, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুবিধা এবং দক্ষিণ এশিয়ায় কৌশলগত অবস্থান সুসংহত করার বিষয়টি চীনের এজেন্ডায় গুরুত্ব পাবে। চীন-বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য বাড়াতে আগ্রহী দু’পক্ষই, এটা একটি ভালো দিক। তিনি বলেন, তিস্তা মাস্টার প্ল্যানসহ বিভিন্ন বিআরআই প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন, শিল্প স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বজায় রাখার বিষয়েও আগ্রহী মনে হচ্ছে চীনকে। 

তিস্তা মাস্টার প্ল্যান দ্রুত বাস্তবায় করা দরকার, এতে করে বাংলাদেশ উপকৃত হবে। ভারতের আপত্তি থাকলেও আমাদের উচিত চীনের সহযোগিতা নিয়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা। এ প্রেক্ষাপটে আসন্ন বৈঠক দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখা বাংলাদেশের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।