দুবাই থেকে ইসরায়েলগামী একটি যাত্রীবাহী বিমানে কাপ্টেনকে কে-পাইলটের ছুরিকাঘাত ও বিমানটি বিধ্বস্ত করার চেষ্টা ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন হামলা নয়; বরং ইসরায়েল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ। উদ্দেশ্য ছিল ঘটনাটির দায় ইরানের ওপর চাপিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে আবারও ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে টেনে আনা।
শুক্রবার (২ অক্টোবর) বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাতে এক প্রতিবেদনে এই দাবি করেছে ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম প্রেস টিভি।
নাম প্রকাশ না করা এক আঞ্চলিক সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে সঙ্গে নিয়ে গোপনে সংযুক্ত আরব আমিরাত সফরের মাত্র ২ দিন পরই কথিত বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে।
সূত্রটির দাবি, গত ২৯ সেপ্টেম্বর নেতানিয়াহু আবুধাবি সফরে আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে এ ধরনের একটি পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন। ওই পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল বিমান ছিনতাইয়ের মতো একটি ঘটনা ঘটিয়ে তার দায় ইরানের ওপর চাপানো। এর মাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জটিল পরিস্থিতিতে ফেলা এবং যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন করে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপে উৎসাহিত করা।
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, নেতানিয়াহুর জন্য বিষয়টির একটি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মাত্রাও রয়েছে। আসন্ন ইসরায়েলি নির্বাচনের আগে নিরাপত্তা ইস্যুকে সামনে এনে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করার পাশাপাশি ইরানকে ঘিরে নতুন সংকট তৈরি করা তার কৌশলের অংশ হতে পারে।
সূত্রটি জানিয়েছে, ‘নেতানিয়াহু গভীরভাবে উদ্বিগ্ন যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে তার জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করতে পারবে না। সেক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে অপসারণের পর তাকে বাকি জীবন কারাগারে কাটাতে হবে’।
প্রসঙ্গত, বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তেলআবিবের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা হওয়া ফ্লাইদুবাইয়ের ফ্লাইট এফজেড১০৭৩-এর কো-পাইলট কাপ্টেনকে ছুরিকাঘাত করার ঘটনা ঘটে। এতে প্রায় ১৮০ জন যাত্রী ছিলেন, যাদের অধিকাংশই ইসরায়েলি নাগরিক।
ফ্লাইট-ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, উড্ডয়নের প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর বিমানটির গতিপথে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা যায়। বিমানটি প্রায় ৩৩ হাজার ফুট উচ্চতা থেকে মাত্র এক মিনিটের মধ্যে প্রায় ১৭ হাজার ফুটে নেমে আসে। এরপর এটি জর্ডান সীমান্তের কাছে অস্বাভাবিকভাবে ঘুরতে থাকে।
এ সময় বিমান থেকে জরুরি সংকেত পাঠানো হয়। প্রথমে সাধারণ জরুরি সংকেত এবং পরে জরুরি সংকেত ‘৭৭০০’ পাঠানো হয়।
জরুরি সংকেত পাওয়ার পরপরই ইসরায়েলি নিরাপত্তা ব্যবস্থায় উচ্চ সতর্কতা জারি হয়। সম্ভাব্য বিমান ছিনতাইয়ের আশঙ্কায় ইসরায়েল যুদ্ধবিমানও প্রস্তুত করেছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
তবে এক পর্যায়ে বিমানে উপস্থিত যাত্রী এবং অন্য বিমানকর্মীরা হামলাকারীকে বাধা দেন এবং ক্যাপ্টেনকে উদ্ধার করেন।
এক যাত্রী ইসরায়েলি সম্প্রচারমাধ্যম কানকে জানান, হামলাকারীকে নিয়ন্ত্রণে আনতে তারা যাত্রীদের দেওয়া হেডফোনের তার ব্যবহার করে তাকে বেঁধে ফেলেন। এ সময় বিমানের অন্য পাইলট ও ক্রুরা বিমানের নিয়ন্ত্রণ নেন।অবশেষে বিমানটি সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল শহর তাবুকের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। পরে তাবুক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে বিমানটি।
এদিকে অবতরণের পরই কো-পাইলটকে আটক করে সৌদি কতৃপক্ষ। ঘটনার উদ্দেশ্য, পাইলটদের মধ্যে সংঘর্ষের সুনির্দিষ্ট কারণ এবং পুরো ঘটনার ধারাবাহিকতা নিয়ে তদন্ত এখনো চলছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি ওমানের নাগরিক বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পরে এক ভিডিও বার্তা নেতানিয়াহু দাবি করেন, বিমানটি বিধ্বস্ত করে ইসরায়েলিদের হত্যা করতে চেয়েছিলেন ওমানি কো-পাইলট।
তিনি আরও বলেন, আটক কো-পাইলটের মধ্যে ইসলামপন্থী উগ্রবাদে প্রভাবিত হওয়ার আলামত পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে তিনি ইরানের সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
তবে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইসরায়েলি কর্মকর্তারাই বলেছেন—ইরানের সংশ্লিষ্টতার কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি এবং হামলাকারী একাই কাজ করেছে কি না, সেটিও তদন্তাধীন।
ইসরায়েলিদের হত্যা করতে চেয়েছেন বিমানটির ওমানি কো-পাইলট!
সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই শহর থেকে ফ্লাইদুবাই সংস্থার যে বিমানটি ইসরায়েলের তেলআবিব যাচ্ছিল, তার ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছর ভারতীয় নাগরিক।
বিমানটির কো-পাইলট ছিলেন ওমানের নাগরিক। মাঝ আকাশে হঠাৎ ৩৪ হাজার ফুট উচ্চতা থেকে ফ্লাইদুবাইয়ের ওই বিমানটিকে দুই মিনিটে ১৭ হাজার ফুট নিচে নামিয়ে আনেন।
তার উদ্দেশ্য ছিল বিমানটি বিধ্বস্ত করে সব ইসরায়েলি যাত্রীকে হত্যা করা। বিমানটি সৌদি আরবে জরুরি অবতরণের পর সেই কো-পাইলটকে গ্রেফতার করে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
এ ব্যাপারে কোনো তথ্যই সৌদি আরব এখন পর্যন্ত দেয়নি। তবে, ইসরায়েলি গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে দাবি করা হচ্ছে, ওমানের নাগরিক ওই কো-পাইলট ইহুদি-বিদ্বেষী। এ কারণে তিনি সব ইসরায়েলি যাত্রীদের হত্যা করতে চেয়েছেন বিমানটি বিধ্বস্ত করার মাধ্যমে।
এ জন্য তিনি ভারতীয় পাইলটকে ছুরিকাঘাত করে বিমানটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ৩৪ হাজার ফুট উচ্চতা থেকে ফ্লাইদুবাইয়ের ওই বিমানটিকে হঠাৎ ১৭ হাজার ফুট নিচে নামিয়ে আনেন। রক্তে ভেসে যাচ্ছিল ককপিট।
এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, বিমান সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। যেকোনো মুহূর্তে তা ভেঙে পড়বে বলে তারা ধরেই নিয়েছিলেন। তবে নিরাপদেই সবাই সৌদিতে নেমেছেন।
বুধবার সকালের ঘটনা নিয়ে দীর্ঘক্ষণ নীরব ছিল ফ্লাইদুবাই। কয়েক ঘণ্টা পরে তারা মুখ খোলেন। তাদের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দুবাই থেকে তেলআবিবগামী বিমানের ককপিটে একটি হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছিল, যার ফলে বিমানটিকে সৌদি আরবে অবতরণ করাতে হয়।
সংস্থার এক মুখপাত্র বলেন, বিমানে সংস্থার কর্তব্যরত কর্মকর্তরাই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। বিমানটিকে ঘুরিয়ে তারা সৌদির তাবুক বিমানবন্দরে অবতরণ করান। প্রাথমিক পর্যায়ে এই ঘটনার নেপথ্যের কারণ ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু জানা যায়নি।
বিষয়টি তদন্তের আওতায় রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তথ্য সংগ্রহ করছেন। এই পরিস্থিতিতে সব পক্ষকে বলছি, অনুমান বা জল্পনা থেকে বিরত থাকুন। যাত্রীদের দেশে ফেরানোর জন্য বিকল্প বিমানের বন্দোবস্ত করেছে ফ্লাইদুবাই। তাতে করে যাত্রীরা তেলআবিবে পৌঁছেও গিয়েছেন।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম সূত্রে এমনটাই দাবি করা হয়েছে আক্রান্ত ওই ভারতীয় পাইলট ২০২২ সাল থেকে দুবাইয়ের বিমান সংস্থার সঙ্গে যুক্ত। তার আগে ছিলেন ভারতীয় সংস্থা স্পাইসজেটে।
বুধবার সকালে ফ্লাইদুবাইয়ের এফজেড১০৭৩ বিমানটি চালাচ্ছিলেন স্মিত মচ্ছর। মাঝ-আকাশে ককপিটের মধ্যেই তার ওপর হামলা হয়। স্মিতকে কোপানো হয় ছুরি দিয়ে। তার সহকারী পাইলট এই আক্রমণ করেছেন বলে জানা গিয়েছে।
বিমানে উপস্থিত যাত্রী এবং অন্য বিমানকর্মীরা হামলাকারীকে বাধা দেন এবং ক্যাপ্টেনকে উদ্ধার করেন। ১৮০ জন যাত্রী-সহ বিমানটিকে সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করানো হয়। হামলাকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। স্মিত আপাতত সৌদির হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
জানা গেছে, গুজরাতি বংশোদ্ভূত স্মিত ২০১১ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত স্পাইসজেটে বিমান চালিয়েছেন। ১১ বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে দুবাইয়ের সংস্থায় যোগ দেন তিনি।
বোয়িং৭৩৭ বিমানের বিশেষজ্ঞ স্মিত। নিজে বিমান চালানোর পাশাপাশি অন্য পাইলটদের মেন্টরিংয়ের কাজও তিনি করেছেন। ওয়েলিংকর ইনস্টিটিউট অফ ম্যানেজমেন্টের বিজনেস অ্যাডমিনস্ট্রেশনের ডিগ্রি রয়েছে তার।
ফ্লাইদুবাইয়ের ঘটনাটিকে সন্ত্রাসবাদী হানা বলে দাবি করেছে ইসরায়েল। জানা গিয়েছে, আক্রমণকারী সহকারী পাইলট ওমানের নাগরিক। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজের দাবি, ইসরায়েলি যাত্রীদের খুন করার উদ্দেশ্যেই ওই বিমান ধ্বংসের চেষ্টা করা হয়েছিল।
‘সন্ত্রাসবাদী হামলার চেষ্টা’ বলে উল্লেখ করেছেন তিনি এই ঘটনাকে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দাবি, বিমানটিকে ‘ক্র্যাশ’ করাতে চেয়েছিলেন অভিযুক্ত। যাত্রীদের সাহসিকতাকে তিনি কুর্নিশ জানিয়েছেন। সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছে তার সরকার। সেখানে অভিযুক্তকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
নেতানিয়াহু বিবৃতিতে বলেছেন, ‘সব যাত্রী এখন বিপদমুক্ত। ওই পাইলটকে গ্রেফতার করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছি।’
নেতানিয়াহু আরও বলেন, ‘যেসব হিরো অসাধারণ সাহসের পরিচয় দিয়েছেন, তাদের স্যালুট। তারা অনেক প্রাণ বাঁচিয়েছেন। বড় দুর্ঘটনা এড়িয়েছেন। বিমানটি সৌদি আরবে নিরাপদে অবতরণ করেছে।’
প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান অনুযায়ী, বিমানটি ‘হাইজ্যাক’ করার চেষ্টা হয়েছিল। ককপিটে গোলমালের খবর পেয়েই সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। যাত্রীদের আসনেও কয়েকজন পাইলট ছিলেন। তারা ককপিটে ঢুকে হামলাকারীকে নিরস্ত্র করেন এবং বিমানটিকে সামাল দেন কোনো রকমে।
এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, বিমান সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। যেকোনো মুহূর্তে তা ভেঙে পড়বে বলে তারা ধরেই নিয়েছিলেন। তবে নিরাপদেই সবাই সৌদিতে নেমেছেন।
