স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশিতঃ ০২ অক্টোবর ২০২৬ ০৯:৫১:৩৭ পূর্বাহ্ন
নেত্র নিউজের প্রতিবেদন বিভ্রান্তিকর ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত: বিজিবি 

সম্প্রতি নেত্র নিউজের সোশ্যাল প্লাটফর্মে '[জুলাই অনুসন্ধান] জেনারেলের দায়মুক্তি' শিরোনামে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলি নিয়ে প্রচারিত একটি দীর্ঘ প্রতিবেদনে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং এর মহাপরিচালকের বিরুদ্ধে স্পর্শকাতর বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বিজিবির গুলিতে ৮৬ জন নিহত হওয়ার দাবি, বিভিন্ন স্থানে বিজিবির নির্বিচার গুলিবর্ষণ, ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ ও ভূমিকা সম্পর্কে এমনভাবে বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন এসব অভিযোগ ইতোমধ্যে বিচারিকভাবে প্রতিষ্ঠিত সত্য। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ উক্ত প্রতিবেদনের বিভ্রান্তিকর ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত উপস্থাপনার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছে।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত প্রতিটি প্রাণহানি গভীর বেদনার এবং প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার জরুরি। বিজিবি এ প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করে না। তবে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে অভিযোগ, প্রমাণ এবং প্রতিষ্ঠিত সত্যের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য থাকা প্রয়োজন। নেত্র নিউজ বিজিবি ও এর মহাপরিচালককে নিয়ে যে ভিডিও প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, সেখানে মূল প্রশ্নটির নির্ভরযোগ্য উত্তর পাওয়া যায় না: মহাপরিচালকের কোন্ নির্দিষ্ট নির্দেশ, কোন্ মাধ্যমে, কীভাবে কোন্ নির্দিষ্ট মৃত্যুর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। এই কার্যকারণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা না করেই প্রতিবেদনে বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নির্বাচিত তথা আয়োজনকৃত সাক্ষ্য, স্থিরচিত্র এবং চলমান অনুসন্ধান কিংবা অভিযোগকে পরপর সাজিয়ে মহাপরিচালককে ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করে একটি মনগড়া ধারণা তৈরি করা হয়েছে। একটি বক্তব্য ও দৃশ্য বারবার ব্যবহারের কারণে সেই ধারণাটি আরও জোরালো করার প্রচেষ্টা প্রকটভাবে দৃশ্যমান হয়েছে। নেত্র নিউজের বিস্তারিত প্রতিবেদনে নতুন কোনো তথ্য-উপাত্ত বা প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি; বরং মিডিয়ায় প্রচারিত বিভিন্ন ফুটেজ একত্রিত করে একটি পূর্বনির্ধারিত আক্রোশমূলক ও ষড়যন্ত্রমূলক বয়ান তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে। প্রতিবেদনটি পর্যালোচনায় নিম্নলিখিত অসংগতিগুলো বিশেষভাবে দৃশ্যমান:

১. ভিন্ন প্রেক্ষাপট, একই বক্তব্য বারংবার ব্যবহার করে বিভ্রান্তির চেষ্টাঃ বিটিভি ভবনে হামলা ও অগ্নিসংযোগের প্রেক্ষাপটে দেওয়া মহাপরিচালকের বক্তব্য প্রতিবেদনে মোট ০৯ বার দেখানো হয়েছে [০০:০০-০০:১৬, ০০:২৬-০০:৩০, ০২:২২-০২:৩১, ০৫:৩২-০৫:৩৯, ০৫:৪৭-০৬:২৬, ০৬:৪২-০৭:১৩, ০৭:৩১-০৭:৫০, ০৮:৫৩-০৮:৫৯, ০৯:২৭-০৯:৪০]। এই বক্তব্যের পাশাপাশি শিশু তামিম শিকদার ও কিশোর আশিকুল ইসলামের মৃত্যুর ঘটনা উপস্থাপন করা হয়েছে। ফলে সম্পাদনার বিন্যাস থেকে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে মহাপরিচালকের বক্তব্যটি ওই শিশু-কিশোরদের উদ্দেশ্য করেই দেওয়া হয়েছিল। অথচ তাঁর বক্তব্যে তাদের নাম বা প্রসঙ্গ ছিল না; বক্তব্যটি ছিল সরকারি সম্পদে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা নিয়ে। একই সময় বিজিবির গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, সরকারি স্থাপনা ভাঙচুর এবং বিটিভি ভবনে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছিল, যার উল্লেখ জাতিসংঘের প্রতিবেদনেও রয়েছে। ফলে বক্তব্যটির পূর্ণ প্রেক্ষাপট ছাড়া পরবর্তী প্রাণহানির দৃশ্যের সঙ্গে সেটি জুড়ে দেওয়া দর্শকের কাছে ভিন্ন অর্থ তৈরি করতে পারে।

২. সময়ের ধারাবাহিকতা – কার্যকারণ নয়ঃ  প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মহাপরিচালকের বক্তব্যের পর ৩৬টি মৃত্যুর মধ্যে ৩৫টি ঘটেছে। কিন্তু কোনো ঘটনার আগে বা পরে দুটি বিষয় সংঘটিত হলেই প্রথমটি দ্বিতীয়টির কারণ হয়ে যায় না। কার্যকারণ প্রমাণ করতে হলে দেখাতে হয়, বক্তব্যের পর মাঠপর্যায়ে নতুন কোনো নির্দেশ, লিখিত আদেশ, বেতার বার্তা বা অপারেশনাল নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল কিনা এবং সেই নির্দেশনার সঙ্গে নির্দিষ্ট মৃত্যুর প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ছিল কিনা। প্রতিবেদনে এমন কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। বরং নেত্র নিউজ নিজেই জানিয়েছে, রামপুরায় গুলি শুরু হয়েছিল ১৮ জুলাই রাতে, অর্থাৎ ১৯ জুলাই দুপুরে দেওয়া মহাপরিচালকের বক্তব্যের আগেই। [০৮:২৩-০৮:৪০] ফলে শুধু সময়ক্রমের ভিত্তিতে বক্তব্য ও প্রাণহানির মধ্যে কার্যকারণ প্রতিষ্ঠা যুক্তিসংগত নয়।

৩. স্থিরচিত্র কখনও আদেশ/নির্দেশের প্রমাণ নয়ঃ মহাপরিচালক ও ব্যাটালিয়ন অধিনায়কের কথোপকথনের তিনটি স্থিরচিত্র দেখানো হয়েছে [০৯:৪০-১০:০০]। মহাপরিচালক একজন মেজর জেনারেল পদমর্যাদার কর্মকর্তা, পক্ষান্তরে ব্যাটালিয়ন কমান্ডার একজন লে. কর্নেল পদ পদমর্যাদার কর্মকর্তা। মাঠপর্যায়ে একজন মহাপরিচালকের পরিদর্শন একটি নিয়মিত স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ। সব বাহিনীতেই এই রেওয়াজ আছে। যেকোন পরিদর্শনে  মাঠ পর্যায়ের দায়িত্বপালনকারী কর্মকর্তা উর্দ্ধতন কর্মকর্তাকে ব্রিফ করে থাকেন। উক্ত ছবিতে স্পষ্টত যে, বর্ণিত পরিদর্শনের সময়ে মিডিয়া ও অন্যান্য বাহিনীর সদস্য উপস্থিত ছিল। এই পরিদর্শনকে ভিন্নভাবে উপস্থাপনের সুযোগ নেই। প্রতিবেদক কর্তৃক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রাকটিস, রেওয়াজ ও চেইন অব কমান্ডকে অপব্যাখ্যা করা হয়েছে। এখানে প্রতিবেদন কর্তৃক প্রমাণ হিসেবে নতুন কোন নির্দেশ, লিখিত আদেশ বা বেতার বার্তার প্রমান উপস্থাপন করেনি।ছবিতে বিজিবি ছাড়াও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদেরও দেখা গেছে। ঘটনাস্থলে সাংবাদিকরাও উপস্থিত ছিলেন। এরপরও নেত্র নিউজ উদ্দেশ্যমূলক ফ্রেমিং করে শুধু বিজিবি মহাপরিচালকের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ এনেছে, তা প্রতিষ্ঠার জন্য অডিও, লিখিত আদেশ, বেতার বার্তা বা অন্য কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ প্রয়োজন। প্রতিবেদনে এমন কোনো উপাদান দেখানো হয়নি। ফলে ছবির মাধ্যমে যতটুকু আপাত ভাবে দৃশ্যমান হয়, তার চেয়ে অনেক বিস্তৃত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সিদ্ধান্ত টানা হয়েছে।

৪. কমান্ড রেসপন্সিবিলিটির অপব্যাখ্যাঃ কোনো বাহিনীর প্রধান হওয়ার কারণে অধীনস্থ প্রত্যেক সদস্যের প্রতিটি কাজের ব্যক্তিগত দায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাহিনীপ্রধানের ওপর বর্তায় না। কমান্ড দায় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সাধারণত বিবেচ্য হয়, সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানতেন বা জানার যুক্তিসংগত কারণ ছিল কি না, বেআইনি নির্দেশ দিয়েছিলেন কি না, অথবা অপরাধ প্রতিরোধ কিংবা পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণে ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যর্থ হয়েছিলেন কি না। প্রতিবেদনে এই মানদণ্ড দর্শকের সামনে স্পষ্ট করা হয়নি। একইভাবে জাতিসংঘের প্রতিবেদন থেকে বিজিবির বিরুদ্ধে উত্থাপিত পর্যবেক্ষণ উল্লেখ করা হলেও বিজিবির নির্দেশনার যে অংশে জীবনহানির চরম ঝুঁকি ছাড়া বলপ্রয়োগ না করা এবং প্রয়োজনে সতর্কতামূলক ফাঁকা গুলির কথা বলা হয়েছে, সেটি যথাযথ প্রেক্ষাপটে উপস্থাপিত হয়নি। জাতিসংঘ সংশ্লিষ্ট বক্তব্য ও পাল্টা বক্তব্য উভয়ই বিবেচনায় নিয়েছে; নেত্র নিউজের উপস্থাপনায় সেই ভারসাম্য দৃশ্যমান নয়। [০১:১৬-০১:৪৪]

৫. তথ্য উপাত্ত বিভ্রান্তিকরঃ নেত্র নিউজের একই প্রতিবেদনে যৌথ ঘটনাগুলোতে নিহতের সংখ্যা ৬১ জন, চিত্রে ৬৩ জন এবং বিজিবির একক সংশ্লিষ্টতার ক্ষেত্রে ২৭টি ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে ভিডিওতে বলা হয়েছে "অন্তত ৮৬"। অনুসন্ধান চলাকালে সংখ্যা পরিবর্তিত বা হালনাগাদ হতে পারে। কিন্তু সে ক্ষেত্রে কোন নতুন তথ্যের ভিত্তিতে সংখ্যা পরিবর্তিত হয়েছে, কোন সময়সীমা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে এবং কোন মৃত্যুকে কী ধরনের প্রমাণের ভিত্তিতে বিজিবির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে, তার ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন। স্রেফ 'নিজস্ব অনুসন্ধান' বলে এমন স্পর্শকাতর তথ্য উপস্থাপন অসাংবাদিকসুলভ অপেশাদারি আচরণ। প্রতিবেদনে  ময়নাতদন্ত, উদ্ধার করা গুলি, ব্যালিস্টিক পরীক্ষা, ভিডিও, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য বা অন্য কোন্ প্রমাণের ভিত্তিতে প্রতিটি মৃত্যুর দায় আলাদাভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে তার কোনো পূর্ণাঙ্গ তালিকা দেওয়া হয়নি। [০১:০০-০১:১০]

৬. ফরেনসিক ছাড়াই গুলির দায় চাপানোঃ সিলেটের গোলাপগঞ্জের ঘটনায় একজন শোকাহত স্বজন ক্ষত দেখে সেটিকে "বিজিবির গুলি" বলে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও শোক অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য; তবে কোন্ অস্ত্রের গুলিতে মৃত্যু হয়েছে, তা নির্ধারণের জন্য ময়নাতদন্ত, ব্যালিস্টিক পরীক্ষা এবং অন্যান্য ফরেনসিক প্রমাণ প্রয়োজন। বিজিবির রেকর্ড অনুযায়ী, সেখানে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে পুলিশ ও বিজিবি কর্তৃক কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি চালানো হয়েছিল। ম্যাজিস্ট্রেটের সাক্ষ্য অনুযায়ী, ওই গুলিতে কেউ হতাহত হননি। এখানে হতাহতের ঘটনা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই; প্রশ্ন হলো, কোন্ অস্ত্র বা কোন্ বাহিনীর গুলিতে হতাহতের ঘটনা ঘটেছিল। ঘটনাস্থলে অন্য বাহিনী এবং অসামরিক ব্যক্তির উপস্থিতিও ছিল। ফলে ফরেনসিক প্রমাণ ছাড়া নির্দিষ্ট বাহিনীর ওপর দায় আরোপ করা অনুসন্ধানের মানদণ্ড পূরণ করে না। [১৬:২৫-১৭:২৫]

৭. প্রতিবেদনের বয়ান পূর্ব প্রকাশিত তথ্য বা সংবাদের সাথে সাংঘর্ষিকঃ প্রতিবেদনের ১০:৪২ মিনিটে রামপুরার ডেল্টা হাসপাতালে সিঁড়িতে পড়ে থাকা ইসমাইলের মরদেহের পেছনের কাচের প্রতিফলনে বেশ কয়েকজন অন্য একটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যকে দেখা যায়। কিন্তু ঘটনাটি প্রতিবেদনে বিজিবির কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতায় উপস্থাপন করা হয়েছে। অথচ ২০২৫ সালের ১৯ জানুয়ারি দ্য ডেইলি স্টারসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে রামপুরায় হাসপাতালের গেটের বাইরে পুলিশের গুলিতে ইসমাইল আহত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে (https://bangla.thedailystar.net/news/bangladesh/crime-justice/news-644166)। ফলে ভিডিওতে ব্যবহৃত দৃশ্য এবং পূর্বে প্রকাশিত সংবাদে বর্ণিত ঘটনার মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে, তা ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন ছিল। একইভাবে, প্রতিবেদনের ১৭:০৫ মিনিটে নাজমুল ইসলামের মৃত্যুকে বিজিবির গুলির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা হয়েছে। অথচ ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট দৈনিক যুগান্তরসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে বলা হয়, গোলাপগঞ্জে পুলিশ গুলিবর্ষণ, কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে চারজন মারা যান। ওই প্রতিবেদনে নিহতদের মধ্যে তাজউদ্দিন (৩৫), নাজমুল ইসলাম ও ছানি আহমদের (১৮) নাম উল্লেখ করা হয় (https://www.jugantor.com/country-news/834167)। অতএব, নাজমুল ইসলামের মৃত্যুর জন্য নির্দিষ্টভাবে বিজিবির গুলিকে দায়ী করতে হলে পৃথক ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ, বিশেষ করে ময়নাতদন্ত, ব্যালিস্টিক বা অন্যান্য ফরেনসিক তথ্য উপস্থাপন করা প্রয়োজন ছিল। বিভিন্ন উৎসে ভিন্ন বর্ণনা থাকলে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের দায়িত্ব হলো সেই বিরোধপূর্ণ তথ্যগুলো দর্শকের সামনে তুলে ধরা এবং কোন প্রমাণের ভিত্তিতে একটি নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা ব্যাখ্যা করা।

৮. যাচাইহীন দাবি ও সুপরিকল্পিত প্রশ্নঃ নরসিংদীর ড্রিম হলিডে পার্কে বিজিবির অস্থায়ী ক্যাম্প ছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু সেই দাবির পক্ষে কোনো মোতায়েন আদেশ, পার্ক কর্তৃপক্ষের বক্তব্য বা যাচাইযোগ্য ভিডিও উপস্থাপন করা হয়নি। বিজিবির দাপ্তরিক রেকর্ড অনুযায়ী, সেখানে বিজিবির কোনো ক্যাম্প ছিল না। সাক্ষী একাধিক বাহিনীর উপস্থিতির কথা বললেও প্রশ্নের ধারা বিজিবিকে কেন্দ্র করেই এগিয়েছে। [১৪:২১-১৫:৩০] এমন পরিস্থিতিতে নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের প্রশ্ন হওয়া উচিত ছিল: সাক্ষী কোন্ কোন্ বাহিনীকে ঘটনাস্থলে দেখেছেন, কাকে গুলি চালাতে দেখেছেন এবং কী প্রমাণের ভিত্তিতে তিনি গুলিটি নির্দিষ্ট কোনো বাহিনীর বলে শনাক্ত করেছেন।

৯. মহাপরিচালককে নিয়ে অপপ্রচার - উদ্দেশ্যপ্রণোদিতঃ বিজিবি মহাপরিচালক প্রায় ৬০ হাজার সৈনিক ও কর্মকর্তার একটি বাহিনীর প্রধান। মাঠপর্যায়ের একজন সৈনিক বা অধিনায়কের সঙ্গে মহাপরিচালকের মধ্যে একাধিক স্তরের কমান্ড কাঠামো রয়েছে। ফলে কোনো মাঠপর্যায়ের ঘটনার জন্য মহাপরিচালকের ব্যক্তিগত দায় প্রতিষ্ঠা করতে হলে কমান্ড কাঠামোর মধ্য দিয়ে নির্দিষ্ট নির্দেশ কীভাবে নিচে গেছে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা সে নির্দেশ কীভাবে পেয়েছেন এবং সেই নির্দেশ কীভাবে নির্দিষ্ট ঘটনার কারণ হয়েছে, তা দেখানো প্রয়োজন। এসব মধ্যবর্তী স্তর ও প্রমাণ উপস্থাপন না করে দুই বছরের অধিক সময় পর সরাসরি মহাপরিচালকের ব্যক্তিগত দায়ের প্রশ্ন তোলা হলে সেই সিদ্ধান্তের পক্ষে আরও শক্ত ও প্রত্যক্ষ প্রমাণ প্রয়োজন যা প্রতিবেদনে অনুপস্থিত।

১০. প্রতিবেদনে "যুদ্ধক্ষেত্রেও হয়নি" ধরনের তুলনা ব্যবহার করা হয়েছে [১১:৩৬-১১:৫৭]। কিন্তু কোন্ যুদ্ধ, কোন্ সময়কাল বা কোন্ তুলনামূলক তথ্যের ভিত্তিতে এই মন্তব্য করা হয়েছে, তা ব্যাখ্যা করা হয়নি। একই প্রতিবেদনে ট্রাইব্যুনালের তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তদন্তকারীরা মহাপরিচালকের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তদন্ত চলমান। বিজিবি কোনো বৈধ তদন্ত, বিচার বা জবাবদিহির ঊর্ধ্বে নয় এবং যেকোনো নিরপেক্ষ তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করে আসছে। কিন্তু দায় নির্ধারণের জন্য অভিযোগ ও প্রমাণের মধ্যে স্পষ্ট সংযোগ থাকা প্রয়োজন যা, প্রতিবেদনে অনুপস্থিত।  অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য, সময়ের ধারাবাহিকতাকে কার্যকারণ, স্থিরচিত্রকে নির্দেশের প্রমাণ, ব্যক্তিগত ধারণাকে ফরেনসিক সিদ্ধান্ত এবং অসম্পূর্ণ প্রমাণকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করলে অনুসন্ধানের বিশ্বাসযোগ্যতা দুর্বল হয়। সাংবাদিকতার স্বাধীনতা অপরিহার্য; একইভাবে সেই স্বাধীনতার বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করে প্রমাণ, প্রেক্ষাপট, ন্যায্যতা এবং যাচাইয়ের ওপর।


প্রধান সম্পাদক : এন, ইউ, শোয়েব
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : ফোরকান হোসেন

৪৯/১/এ, পুরানা পল্টন লেন, চতুর্থ তলা, ঢাকা-১০০০।
মোবাইল: ০১৭১৩১৮০০৪৪
ইমেইল: akhonbangla24@gmail.com