হুতিদের বিরুদ্ধে ইয়েমেনে চলমান যুদ্ধ আরও তীব্র হয়ে সৌদি আরবের ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়েছে। এমন অবস্থায় জরুরি বৈঠকের জন্য রিয়াদে যাচ্ছেন পাকিস্তান ও তুরস্কের সেনাপ্রধানরা। সেখানে তারা প্রতিরক্ষা চুক্তি বাস্তবায়নের ওপর আলোচনা করবেন।
শুক্রবার তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় চিফ অব জেনারেল স্টাফ সেলচুক বায়রাকতারগ্লুর সৌদি সফরের তথ্য নিশ্চিত করেছে। পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল অসিম মুনিরও সেখানে যাবেন বলে জানতে পেরেছে আল জাজিরা। এই তিন দেশ গত মাসে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এর আওতায় এক দেশ আক্রান্ত হলে বাকিরাও সেটিকে নিজেদের ওপর হামলা বিবেচনা করবে।
ইরান সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা কয়েক সপ্তাহ ধরে সৌদি আরবের ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এরপর থেকেই রিয়াদকে সমর্থন দেওয়ার ব্যাপারে তৎপরতা শুরু হয়। এবার সৌদির অনুরোধে সেনাপ্রধানরা জরুরি বৈঠকে যোগ দিচ্ছেন।
তিন ধরনের প্রতিক্রিয়া
দেশ তিনটির সেনাপ্রধানদের বৈঠকের ঘোষণাটি এসেছে বৃহস্পতিবার। এদিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে বৈঠক করেন সৌদির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান, পাকিস্তানের ইসহাক দার ও তুরস্কের হাকান ফিদান।
ওই বৈঠক নিয়ে সৌদির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি বিবৃতি দিয়েছে। এতে পবিত্র নগরী মক্কাসহ বেসামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনায় হুতিদের হামলার নিন্দা জানানো হয়। একই সঙ্গে জাতিসংঘ সনদের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদ উল্লেখ করে রিয়াদের আত্মরক্ষার অধিকারের কথা বলা হয়েছে।
অপরদিকে পাকিস্তান তুলনামূলক সতর্ক অবস্থান বজায় রেখে বৈঠকের বিবরণ প্রকাশ করেছে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম এক্সে ইসহাক দার লিখেছেন, ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় আমরা একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার অগ্রগতি পর্যালোচনা করেছি। পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ইস্যুতে মতবিনিময় হয়েছে।’
নিউইয়র্কের ওই বৈঠকে তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও সংযত অবস্থান নিয়েছিল। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, চুক্তিটিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে চলমান ‘কারিগরি আলোচনা’ পর্যালোচনা করা হয়েছে। তবে কয়েকদিন আগে সম্প্রচারমাধ্যম এনটিভিকে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় হাকান ফিদানের কথায় ভিন্ন সুর ছিল।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘চুক্তিতে জোটের প্রতি অঙ্গীকার আছে। আমরা নিজেদের দেওয়া কথা রাখব। কিছু কারিগরি ক্ষেত্রে তাদের (সৌদি) সামরিক প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। সেগুলো পূরণ করতে আমাদের কোনো সমস্যা নেই।’
নিউইয়র্কের বৈঠকটি নিয়ে সৌদির বিবৃতিতে হুতিদের প্রসঙ্গ থাকলেও ইসলামাবাদ বা আঙ্কারার বিবরণে তা উল্লেখ করা হয়নি।
হুতিদের সতর্কবার্তা
গোষ্ঠীটি এর আগে পাকিস্তান ও তুরস্ককে সরাসরি হুমকি দিয়েছিল। বিশ্লেষকের মতে, দেশ দুটির বিবৃতিতে হুতিদের নাম উল্লেখ না করার সঙ্গে ওই হুমকির সম্পর্ক থাকতে পারে।
হুতিদের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য মোহাম্মদ আল-বুখাইতি সম্প্রতি ইরাকের একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, পাকিস্তান ও তুরস্ক যুদ্ধে যোগ দিলে নির্দয়ভাবে জবাব দেওয়া হবে।
অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার ও ইসলামাবাদের ইনস্টিটিউট অব পলিসি স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ সহযোগী তুঘরাল ইয়ামিন আল জাজিরাকে বলেন, পাকিস্তানের পক্ষে সেনা পাঠানো কঠিন। তারা ভেতর ও বাইরের চাপে আছে। অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো যেমন তৎপর তেমনই আফগানিস্তানের সঙ্গেও উত্তেজনা মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
তুঘরাম ইয়ামিন বলেন, সৌদি আরবে সেনা পাঠাতে তুরস্ক রাজি হবে কি না তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। কারণ, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি ছাড়াও দেশটি ন্যাটোর সদস্য। ফলে ওই জোটে তাদের দায়বদ্ধতা আছে। সিরিয়া সীমান্তও পুরোপুরি নিরাপদ নয়।
রিয়াদে জরুরি পরিস্থিতি
হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইকে সৌদির ধর্মীয় নেতৃত্ব জরুরি প্রয়োজন বলে মনে করছে। গোষ্ঠীটিকে পথভ্রষ্ট হিসেবে উল্লেখ করেছেন গ্র্যান্ড মুফতি শেখ সালেহ আল-ফাওজান। সেনাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘সীমান্ত রক্ষা করা এমন একটি দায়িত্ব, যার জন্য জীবন ও প্রাণ উৎসর্গ করতে হয়।’
কয়েকদিন আগে দেওয়া বার্তায় সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদও একই সুরে কথা বলেন। মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে মক্কা নগরীতে হুতিদের হামলা চেষ্টার প্রসঙ্গ তুলে বলেন, এটি ইসলামের পবিত্রতম স্থানের মর্যাদা লঙ্ঘনের শামিল।
ইস্তাম্বুলের ইবনে হালদুন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ গোকহান এরেলি আল জাজিরাকে বলেন, সৌদির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে গ্র্যান্ড মুফতির বার্তাটি গুরুত্বপূর্ণ। তবে পাকিস্তান ও তুরস্কের ওপর সেটির প্রভাব কম। সম্মুখসারির যোদ্ধাদের উজ্জীবিত করতে মুফতি সম্ভবত ওই বার্তা দিয়েছেন। একই সঙ্গে ব্যয়বহুল যুদ্ধকে আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় ভিত্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যও থাকতে পারে।
দীর্ঘ অভিযানের প্রস্তুতি
সৌদি আরবকে এরইমধ্যে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য প্রতিরক্ষামূলক সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। অভিযানে অংশ নেওয়া সৌদি যুদ্ধবিমানগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ করবে যুক্তরাজ্য। শুক্রবার ফ্রান্স জানিয়েছে, তারা ইয়ানবুর প্রধান তেল টার্মিনাল পাহারা দিতে সেনা পাঠাচ্ছে। লোহিত সাগরের এই বন্দরটি সৌদির জ্বালানি পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এক আঞ্চলিক কূটনীতিক আল জাজিরাকে বলেন, সৌদির প্রতি পাকিস্তান, তুরস্ক, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের সমর্থন বাড়ছে। কিন্তু এখনো হুতিদের থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
ওই কূটনীতিক বলেন, হুতিরা ইতোমধ্যে সৌদির সামরিক ও বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার সক্ষমতা দেখিয়েছে। তারা এ ধরনের অভিযান চালিয়ে যেতে চায়। সাম্প্রতিক তৎপরতা দেখাচ্ছে, রিয়াদও দীর্ঘ সময় ধরে অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। এতে আগামী দিনগুলোতে আরও প্রাণহানি ঘটবে।
(আল জাজিরায় প্রকাশিত বিশ্লেষণটি লিখেছেন আবিদ হুসাইন। তিনি গণমাধ্যমটির পাকিস্তান প্রতিনিধি। মূল বিশ্লেষণ থেকে সংক্ষেপে অনুবাদ করা হয়েছে।)
হরমুজ প্রণালি খুলতে যুক্তরাষ্ট্রকে সাতদিনের রূপরেখা দিয়েছে ইরান
এদিকে, যুদ্ধের অবসান ও সাতদিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির বরাত দিয়ে এমন তথ্য জানিয়েছে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ও গার্ডিয়ান।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেওয়ার অংশ হিসেবে আব্বাস আরাঘচি নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন। গণমাধ্যম দুটিকে তিনি বলেন, নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ হলে সাতদিনের মধ্যে প্রণালিটি খুলে দেওয়া ও আলোচনা শুরু হবে।
ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে গত মঙ্গলবার জাপানের বার্তা সংস্থা ‘কিয়োদো’ প্রথম এমন তথ্য প্রকাশ করেছিল। কিন্তু প্রতিবেদনটির দাবি তখন ইরানি গণমাধ্যম অস্বীকার করে। একইদিন নিউইয়র্কে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে বৈঠক করেন আরাঘচি।
নিউইয়র্ক টাইমস আরাঘচির রবাত দিয়ে জানিয়েছে, সবশেষ পরিকল্পনায় সাতদিনের জন্য লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যে সব ধরনের শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ড বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছে। এছাড়া, জব্দকৃত অন্তত ১২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের সম্পদ ছাড়, তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার শর্ত আছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, শর্ত পূরণ হলে সপ্তমদিনের মাথায় ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দেবে। আরাঘচি বলেছেন, পরিকল্পনাটির বিষয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জবাবের অপেক্ষায় আছেন। চীনও এই প্রস্তাবকে সমর্থন দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বৃহস্পতিবার ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
এর আগে এএফপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) মুখপাত্র হোসেইন মোহেবি বলেছিলেন, তেহরানের দাবিগুলোর মধ্যে ইয়েমেনে শত্রুতা বন্ধের বিষয়টিও আছে।
যুদ্ধের অবসান ও হরমুজ খুলে দিতে গত জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছিল। এর আওতায় পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা শুরুর কথা ছিল। কিন্তু কিছুদিন পর ওই সমঝোতা ভেঙে যায়। এরপর দুই দেশ হরমুজ প্রণালি ঘিরে পুনরায় সংঘাতে জড়ায়।
