ঢাকা মেইল: কেউ নিখোঁজ ২০১০ সালে, কেউ আবার ২০১১-তে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের টানা তিন মেয়াদে এমন গুমের শিকার ব্যক্তিরা কোথায়, কেমন আছেন তা জানা নেই কারও। আদৌ তারা বেঁচে আছেন কি না, তাও জানা নেই কারও। তবুও আশায় বুক বেঁধে আছে গুমের শিকার পরিবারগুলো, তাদের নিখোঁজ সদস্য হয়তো একদিন ফিরে আসবেন।
আওয়ামী লীগের আমলে খুন হয়েছেন- এমন বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের পরিবার এখনো চোখের পানি ফেলছেন। তাদের কারও জীবন কাটছে নানা অর্থকষ্টে। কারণ পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটিকে হারিয়েছেন তারা।
সবশেষ ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানেও প্রাণ হারিয়েছেন অসংখ্য ছাত্র-জনতা এবং বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী। ধুঁকে ধুঁকে জীবন চলা এসব ভুক্তভোগী পরিবারগুলো যখন বুকে কষ্ট চেপে দিন পার করছেন, তখন তাদের পাশে দাঁড়াল রাষ্ট্র। গুম-খুন ও জুলাই আন্দোলনে শহীদ ও গুরুতর আহত— এমন ৭৪টি পরিবারের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে বর্তমান বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার।
শনিবার (২৯ আগস্ট) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভুক্তভোগী পরিবারের ১০ জনের হাতে নিয়োগপত্র তুলে দেন। পরে বাকিদের হাতেও তুলে দেওয়া হয় চাকরির নিয়োগপত্র।
জানা গেছে, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডে বিভিন্ন পদে তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি দেওয়া হয়েছে।
একদিকে কষ্টেভরা জীবন, অন্যদিকে ঘুরে দাঁড়াতে সরকারের এই সহায়তায় পরম কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন এসব পরিবারের সদস্যরা। গুম-খুন ও জুলাই আন্দোলনের শহীদের বাকি পরিবারগুলোর পাশেও সরকার যেন দাঁড়ায়, সেই অনুরোধও জানিয়েছেন তারা।
নিয়োগপত্র হাতে পেয়ে খুশি হলেও বক্তব্যের সময় কারও কারও কণ্ঠ বাকরুদ্ধ হয়ে আসে। কেউ আবার কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন প্রধানমন্ত্রীর সামনে। তখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের করবী হলে এক অত্যন্ত আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। ভুক্তভোগীদের আকুতি ছুঁয়ে যায় খোদ প্রধানমন্ত্রীকেও।
আরও পড়ুন: গুম-খুন ও শহীদ পরিবারের ৭৪ জনকে নিয়োগপত্র দিলেন প্রধানমন্ত্রী
সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে সরকারপ্রধান আবেগজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘স্বাভাবিকভাবেই আপনাদের সামনে দেখে আমিও কিছুটা ইমোশনাল বোধ করছি।’ প্রধানমন্ত্রী এ সময় আগামী দিনেও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পাশে থাকার দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দেন।
ভুক্তভোগী পরিবারের কণ্ঠে দুঃসহ যন্ত্রণার গল্প
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে চাকরির নিয়োগপত্র নিতে আসা ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের বক্তব্যে উঠে আসে বছরের পর বছর ধরে বয়ে বেড়ানো দুঃসহ যন্ত্রণার গল্প। কেউ স্মরণ করেন, ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর পক্ষ থেকে ঈদ-পার্বণে আসা উপহারের কথা, কেউ আবার প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সময়ে পাওয়া সহযোগিতার স্মৃতি তুলে ধরেন।
একইসঙ্গে তারা চেয়েছেন স্বজনদের সন্ধান। গুম-খুনের সঙ্গে উচ্চপর্যায় থেকে মাঠপর্যায়ে জড়িত সবার দৃষ্টান্তমূলক বিচারের ব্যবস্থা করতে সরকারের প্রতি আকুল আকুতি জানিয়েছেন তারা।
ভাইয়ের অপেক্ষায় চট্টগ্রামের আকাশ, চাইলেন গুমে জড়িতদের বিচার
চাকরি পাওয়াদের মধ্যে ছিলেন চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির নেতা ও আহলা করলডেঙ্গা ইউনিয়নের টানা তিন মেয়াদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম বাচার ছোট ভাই আকাশ।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা এই তরুণ ঢাকা মেইলকে বলেন, ২০১০ সালের ৮ নভেম্বর প্রশাসনিক কাজে ঢাকায় এসে গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে ডিবির পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় তার ভাই নজরুল ইসলামকে। নিজ এলাকায় অত্যন্ত জনপ্রিয় এই জনপ্রতিনিধি ও রাজনীতিক গুমের পর চট্টগ্রাম র্যাব ক্যাম্পে আছেন—এমন খবরে তখন পুরো এলাকার মানুষ ক্যাম্প ঘেরাও করেছিল বলে জানান আকাশ।
আরও পড়ুন: ‘গুম মৃত্যুর চেয়ে ভয়াবহ, আ.লীগের আমলে এটি ব্যাপক আকার নিয়েছিল’
ভাইয়ের খোঁজে এখনো অপেক্ষায় থাকার কথা জানিয়ে এই যুবক বলেন, ‘র্যাব, পুলিশ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি। ভাইকে পাইনি, শুধু খুঁজে দেখার আশ্বাস পেয়েছি।’
এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ভাইয়ের পথ চেয়ে থাকা আকাশের হাতে আজ চাকরির নিয়োগপত্র মিললেও তার মূল দাবি, গুমের সঙ্গে জড়িত মূলহোতা ও বাস্তবায়নকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি।
বাবার পথ চেয়ে কাটছে তন্ময় দাসদের জীবন
চাকরি পেয়েছেন গুম হওয়া পুরান ঢাকার তপন দাসের ছেলে তন্ময় দাস। কোনো ধরনের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত না থাকা সত্ত্বেও ২০১১ সালের ৩ আগস্ট গেণ্ডারিয়ার লোহারপুল থেকে ডিবি পরিচয়ে অস্ত্রধারীরা তুলে নিয়ে যায় তপন দাসকে।
তার বড় ছেলে তন্ময় দাস ঢাকা মেইলকে জানান, জাতীয় গুমের তালিকায় ৩ নম্বরে থাকা বাবার সন্ধানে ১২-১৩ বছর ধরে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েছেন। বাবার খোঁজে দিশেহারা হয়ে ভন্ড কবিরাজদের পেছনে টাকা খরচ করেছেন, কিন্তু কোনো খোঁজ মেলেনি।
দুই ভাই ও মাকে নিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খাওয়া তন্ময় জানান, এখনো বাবার খোঁজে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথাকথিত তদন্তের নামে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তাদের চাকরির ব্যবস্থা করায় কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘চাকরির ব্যবস্থা হওয়ায় এখন কিছুটা স্বস্তি নিয়ে চলার সুযোগ পাব।’
একটি বুলেট বাবাহারা করে হুজাইফাকে, তছনছ শাহনাজের সংসার
নিয়োগপত্র পাওয়া শাহনাজ বেগমের স্বামী ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই নিউমার্কেটে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান।
শাহনাজ জানান, জুমার নামাজ শেষ করে নিউমার্কেটের ১ নম্বর গেটের সামনে দিয়ে নিজের দোকানের দিকে যাচ্ছিলেন তার স্বামী। ঠিক ওই মুহূর্তে তার সঙ্গে ফোনে কথা বলছিলেন। আচমকা ফোনের ওপাশ থেকে সংযোগটি কেটে যায়। শাহনাজ ভেবেছিলেন নেটওয়ার্কে হয়তো সমস্যা। কিন্তু না, ঠিক সেই মুহূর্তেই একটি বুলেট এসে লাগে তার স্বামীর মাথায়। হাত থেকে ছিটকে রাস্তায় পড়ে যায় মোবাইল ফোনটি।
পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানেই মারা যান এক সন্তানের বাবা হতভাগ্য এই মানুষটি। তার এই আকস্মিক বিদায়ে এক নিমেষে ধূলিসাৎ হয়ে যায় তাদের সাজানো সংসার; পিতৃহীন হয় ৯ বছরের শিশু সন্তান হুজাইফা আকন।
জুলাই শহীদের স্ত্রী শাহনাজ বেগম অত্যন্ত ভারী গলায় সেই রক্তাক্ত দুপুরের স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘আমার স্বামী ২০০০ সালে এসএসসি পরীক্ষা শেষ করে বরিশাল থেকে ঢাকায় আসেন। এখানে পড়াশোনা শেষ করে নিউমার্কেটে নিজের ব্যবসা শুরু করেছিলেন। স্বামীর মৃত্যুতে পুরো পরিবারটি এখন অথৈ সাগরে পড়েছে। আয়ের একমাত্র উৎস নিউমার্কেটের দোকানটি দেখার মতো কেউ না থাকায় ঘটনার পরদিনই বন্ধ করে দিতে হয়েছে। এখন একমাত্র ছেলেকে নিয়ে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি।’
আরও পড়ুন: গুমের ভয়াবহ কালো অধ্যায় আমরা অতিক্রম করেছি: ইশরাক
কান্নাজড়িত কণ্ঠে শাহনাজ ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘যে বয়সে সন্তানের মাথায় বাবার হাত থাকার কথা, সেই বয়সে ও এতিম হয়ে গেল। একা হাতে এই পিতৃহীন সন্তানকে মানুষ করা আমার পক্ষে সত্যিই খুব কষ্টকর। আমি বর্তমান সরকারের কাছে আকুল আবেদন জানাই, তারা যেন আমাদের মতো ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ান এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়তে সাহায্য করেন।’
‘ছুটির দিনেও এখন আর কোথাও ঘুরতে যাই না’
৯ বছর বয়সি শিশুকন্যা হুজাইফা আকন এখনো বিশ্বাস করতে পারে না যে, তার প্রিয় বাবা আর কখনো ফিরে আসবে না। ভাঙা গলায় হুজাইফা বাবাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করে বলে, ‘বাবা আমাকে প্রতিদিন বিকেলে ঘুরতে নিয়ে যেত। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লেকের পাড়ে নিয়ে গিয়ে মাছ খাওয়াতো, নিজের হাতে বাদাম কিনে দিত। এখন বাবা নেই, তাই ছুটির দিনেও আমি কোথাও ঘুরতে যেতে পারি না। বাবাকে আমার খুব মনে পড়ে। যারা আমার বাবাকে গুলি করে মেরেছে, আমি তাদের ফাঁসি চাই।’
পাশে থাকার আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর
নিয়োগপত্র তুলে দিয়ে আবেগঘন কণ্ঠে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘আমাদের দলের মধ্যে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের এবং বিভিন্ন অরাজনৈতিক ব্যক্তি বা পরিবার আছেন যাদের এই দেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে অসামান্য অবদান বা আত্মত্যাগ রয়েছে। সরকারের যত সীমাবদ্ধতাই থাকুক না কেন, আমাদের সর্বাত্মক চেষ্টা থাকবে এই মানুষগুলোর পাশে থাকার, এই পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর।’
তিনি বলেন, ‘আপনাদের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তা কোনোভাবেই পূরণ করা সম্ভব নয়। তবুও এতটুকু বলব- আমাদের অবস্থান থেকে আমরা অতীতেও আপনাদের পাশে ছিলাম, এখনো আছি এবং আগামীতেও ইনশাআল্লাহ থাকব।’
প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রিপরিছদ সচিব নাসিমুল গণি, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবিএম আবদুস সাত্তার, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি, হাসান শিপলু, সুজাউদ্দৌলা, শাহাদাৎ স্বাধীন, সহকারী প্রেস সচিব একেএম নাজমুল হক, শাহরিয়ার পামির, ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর সদস্যসচিব মোকছেদুল মোমিন মিথুন প্রমুখ।
