আন্তর্জাতিক ডেস্ক 
প্রকাশিতঃ ০২ আগস্ট ২০২৬ ০৯:৫৫:০৪ পূর্বাহ্ন
বিশ্লেষণ আলজাজিরার ইরানে হামলা স্থগিত করলেন ট্রাম্প, নেপথ্যে কী

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, দ্রুত একটি চুক্তির মাধ্যমে কয়েক মাস ধরে চলা সংঘাতের অবসান ঘটলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে নতুন করে হামলা চালাবে না।

জ্বালানি অবকাঠামোসহ নতুন করে ভয়াবহ হামলার বিষয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের পালটাপালটি হুমকির পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে আবারও যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।

রোববার (২ আগস্ট) ভোরে নিজের সামাজিক মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ইরান এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ তাকে হামলা স্থগিত করার অনুরোধ করেছে, কারণ ‘একটি চুক্তির রূপরেখা সম্মত হয়েছে’।

তবে তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এমন কোনো অনুরোধ করেছে বলে ট্রাম্পের দাবি সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়েছে ইরান। দেশটির সামরিক কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম বলেছে, এই অভিযোগ ‘নতুন একটি মিথ্যা ছাড়া আর কিছুই নয়’ এবং ইরানের সশস্ত্র বাহিনী ‘সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে ও যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত’।

এদিকে, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি এখনো বন্ধ রয়েছে। পাশাপাশি ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতিদের কারণে লোহিত সাগরেও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

কেন হামলা স্থগিত করলেন ট্রাম্প?

এর আগে ট্রাম্প এক পোস্টে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পুরোপুরি প্রস্তুত’ ছিল। কিন্তু তেহরান এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ তাকে নতুন করে হামলা না চালানোর অনুরোধ করে।

ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, এই অনুরোধের ভিত্তিতে এবং বিশ্বের ভবিষ্যতের কল্যাণে, সেইসঙ্গে একটি সফল ও সমৃদ্ধ ইরান টিকে থাকার স্বার্থে আমি হামলা বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তবে শর্ত হলো দ্রুত একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে হবে।

তিনি জানান, এ চুক্তির মধ্যে থাকবে ‘অবিলম্বে ও পুরোপুরি হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং ইরানের পারমাণবিক হুমকির অবসান।‘ 

পোস্টে তিনি আরও লেখেন, ইসরাইলও আমার সঙ্গে এই প্রতিশ্রুতিতে একমত। সবাই কাজে লেগে পড়ুন এবং এটি সম্পন্ন করুন।

তবে এই চুক্তির শর্ত কী হবে বা কারা এর মধ্যস্থতা করছে, সে বিষয়ে ট্রাম্প বা হোয়াইট হাউস বিস্তারিত কিছু জানায়নি।

এদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, শনিবার সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের নতুন হামলার পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। যুবরাজ ট্রাম্পকে উত্তেজনা কমানোর এবং হামলা চালানো থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।

এর বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় একটি চিন্তার বিষয় হলো তাদের সামরিক মজুত, বিশেষ করে ‘প্যাট্রিয়ট অ্যান্টি-মিসাইল ইন্টারসেপ্টর’ দ্রুত ফুরিয়ে আসা।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের মতে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের মজুত ছিল প্রায় ২,৩০০টি, যা এখন ৮২৭-এর নিচে নেমে এসেছে।

ডেমোক্র্যাট দলীয় মার্কিন সিনেটর ক্রিস ভ্যান হোলেন এবিসি নেটওয়ার্ককে বলেন, আমরা আমাদের ইন্টারসেপ্টরগুলো শেষ করে ফেলছি... যা মার্কিন সেনাদের সুরক্ষার জন্য অত্যন্ত জরুরি। বিশ্বের অন্যান্য স্থানে সম্ভাব্য সংঘাতের ঝুঁকির মধ্যেও আমরা প্রতিদিন এগুলো ব্যবহার করছি।

ইরানের অবস্থান কী?

হামলা স্থগিত বা চুক্তির বিষয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি তেহরান। তবে রোববার ইরানের ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী মজিদ ইবনে আল-রেজা বলেন, শত্রুদের যেকোনো হুমকিকে তেহরান ‘বাস্তব ও বিশ্বাসযোগ্য’ হিসেবে দেখে, এমনকি তা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের অংশ হলেও। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, তিনি বলেছেন, আমরা অপ্রস্তুত থাকব না বা নিষ্ক্রিয়ও থাকব না।

এদিকে, গত সপ্তাহে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির, তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান এবং সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদের সঙ্গে আলাদাভাবে ফোনে কথা বলেন। আরাগচি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কোনো ‘দুঃসাহসিক পদক্ষেপ’ নিলে এবং মার্কিন বাহিনী ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালালে তেহরানও এর চূড়ান্ত ও কঠোর জবাব দেবে।

ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত সংবাদমাধ্যম ‘নুরনিউজ’ শনিবার জানিয়েছে, ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় মার্কিন হামলা হলে এর জবাবে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও ইসরাইলের তেল ও গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে হামলা চালাবে ইরান। তারা বলেছে, ‘সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে যাবে।

ট্রাম্প কোন চুক্তির কথা বলছেন?

কোনো পক্ষ থেকেই এই চুক্তির বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো ধারণা দেওয়া হয়নি। তবে কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্ক এবং পাকিস্তান—এই আঞ্চলিক শক্তিগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে উত্তেজনা কমিয়ে কূটনীতিতে ফেরার তাগিদ দিচ্ছে।

রোববার পাকিস্তানের সরকারি সূত্র তুরস্কের আনাদোলু সংবাদ সংস্থাকে জানায়, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা পুনরায় শুরু হওয়ার বিষয়ে পাকিস্তানি ও কাতারি মধ্যস্থতাকারীদের মধ্যে ‘সতর্ক আশাবাদ’ রয়েছে।

উল্লেখ্য, গত জুনে ইসলামাবাদ ও দোহার মধ্যস্থতায় হওয়া সর্বশেষ যুদ্ধবিরতি খুব দ্রুতই ভেস্তে যায়। এর পেছনে মূল কারণ ছিল হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ। বৈশ্বিক তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে সরবরাহ হয়। ট্রাম্প তার সর্বশেষ বিবৃতিতে বলেছেন, চুক্তির ফলে অবিলম্বে ওই প্রণালিটি আবার খুলে দেওয়া হবে।

তবে তেহরান এর আগে জানিয়েছিল, এ জলপথটি কখনোই যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরে যাবে না। ওমানের সঙ্গে মিলে প্রণালিতে সামুদ্রিক যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে তেহরান আগ্রহ দেখালেও, ট্রাম্প ও উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা তা প্রত্যাখ্যান করেছে।

সমাধান কি সন্নিকটে?

যুদ্ধ শুরুর পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও এই সংঘাতের কোনো শেষ দেখা যাচ্ছে না। 

তেহরান থেকে আলজাজিরার প্রতিবেদক মাহমুদ আবদেলওয়াহেদ জানিয়েছেন, একদিকে ইরান কূটনীতির চেষ্টা করছে, অন্যদিকে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের জন্য অভিযুক্ত করে কড়া বিবৃতি দিয়েছে।

মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো রস হ্যারিসন আলজাজিরাকে বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের স্পষ্ট কৌশল চিহ্নিত করা কঠিন। কারণ ট্রাম্প বারবার বড় হামলার হুমকি দিয়েও পরে পিছিয়ে এসেছেন।

তিনি বলেন, ইরানের দৃষ্টিকোণ থেকে, তারা হয়তো মনে করছে সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকির কারণেই ট্রাম্প পিছু হটেছেন। হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট কোনো চুক্তি না হলে ট্রাম্পের এ ঘোষণা কেবল আরেকটি ‘বিরতি’ হিসেবেই থেকে যাবে বলে তিনি মনে করেন।

হ্যারিসন সতর্ক করে বলেন, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তেহরান ও ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকরা এর ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারেন। তিনি বলেন, এমন একটা সময় আসতে পারে যখন নীতিনির্ধারকরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে দেখবেন, কারণ তারা উত্তেজনা কমাতে চাইলেও অন্যান্য পক্ষগুলো উত্তেজনা বাড়িয়ে দিতে পারে। সূত্র: আলজাজিরা


উপদেষ্টা সম্পাদক : এন, ইউ, বিশ্বাস
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : ফোরকান হোসেন

৪৯/১/এ, পুরানা পল্টন লেন, চতুর্থ তলা, ঢাকা-১০০০।
মোবাইল: ০১৭১৩১৮০০৪৪
ইমেইল: akhonbangla24@gmail.com