ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ভারতে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। ভারতের আশ্রয়ে থাকা সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে মুখ খুলেছে দেশটি। শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর দাবি এবং তার প্রত্যর্পণের বিষয়ে ভারতের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসেনি বলে জানিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নয়া দিল্লির ভাষ্য, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি পুরোপুরি একটি আইনি প্রক্রিয়া এবং প্রচলিত আইন ও দ্বিপক্ষীয় প্রক্রিয়া অনুসারেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) নয়া দিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা রয়েছে তার।
ওই সাক্ষাৎকারের পর শেখ হাসিনার দেশে ফেরা এবং বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ অনুরোধের বিষয়ে ভারতের অবস্থান জানতে চাইলে রণধীর জয়সওয়াল বলেন, এই নির্দিষ্ট বিষয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির কোনো পরিবর্তন হয়নি। যেকোনো প্রত্যর্পণ একটি আইনি বিষয় এবং সেটি আইন ও প্রচলিত প্রক্রিয়া অনুযায়ীই পরিচালিত হবে।
বাংলাদেশ সরকার মানবতাবিরোধী অপরাধ, হত্যা এবং অন্যান্য মামলায় বিচারের মুখোমুখি করতে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ভারতের কাছে একাধিকবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়েছে। তবে ভারত শুরু থেকেই বিষয়টিকে আইনি কাঠামোর মধ্যেই বিবেচনার কথা বলে আসছে।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশে ভারতের অর্থায়নে চলমান ১১টি উন্নয়ন প্রকল্প নিয়েও প্রশ্ন করা হয়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসব প্রকল্পের অগ্রগতিতে স্থবিরতার কারণে সেগুলো স্থগিত হতে পারে বলে দাবি করা হয়েছিল।
এ প্রসঙ্গে রণধীর জয়সওয়াল বলেন, বাংলাদেশে ভারতের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো দুই দেশের পারস্পরিক আলোচনা ও সমঝোতার ভিত্তিতে গ্রহণ করা হয়েছে এবং বর্তমানে সেগুলো একই প্রক্রিয়ায় চলমান রয়েছে।
জয়সওয়াল বলেন, বাংলাদেশে আমাদের যে উন্নয়ন প্রকল্প কর্মসূচি রয়েছে, তা সম্পূর্ণভাবে দুই দেশের পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং এখনো সেইভাবেই এগিয়ে চলছে।
হঠাৎ হাসিনার দেশে ফেরার ডেটলাইন, নেপথ্যে কী?
গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত ও মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হঠাৎ করেই দেশে ফেরার নির্দিষ্ট সময়ক্ষণ ঘোষণা করেছেন। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে তিনি আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরে দলের অন্য নেতাদের নিয়ে আদালতে আত্মসমর্পণের ঘোষণা দেন। এর আগে ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভিকেও তিনি চলতি বছরের মধ্যে ফেরার কথা বলেছিলেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের মতে, নেতাকর্মীদের ছন্নছাড়া দশা, শীর্ষ নেতাদের বিদেশে বিলাসী জীবন এবং দল নিষিদ্ধ হওয়ার পর রাজনীতিতে চরম অপ্রাসঙ্গিক শেখ হাসিনার এটি অস্তিত্ব জানান দেওয়ার কৌশল। অন্যদিকে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের এই আবহে হঠাৎ এই ঘোষণা আদতে কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে নানামুখী আলোচনা শুরু হয়েছে।
শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে কারাগারে যেতে হবে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কোনো আসামির জামিন পাওয়ার নজির নেই বলে জানিয়েছেন তিনি। রোববার (১২ জুলাই) নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আমিনুল ইসলাম বলেন, আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত কোনো মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির জামিন হয়েছে, এমন নজির নেই। ফলে দেশে আনা মাত্রই তাকে প্রথমে জেলে যেতে হবে এবং এরপর তার আপিল করার আইনি অধিকারের বিষয়টি নিষ্পত্তি হবে। ডিসেম্বর নয়, আগামীকালই শেখ হাসিনা আসুন- এমনটা তারা চান বলেও জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর।
রয়টার্সে কী বলেছেন শেখ হাসিনা?
প্রায় এক ঘণ্টার দীর্ঘ টেলিফোন সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ সরকার তাকে ফেরত পাঠাতে ভারতকে চিঠি দিলেও তিনি নিজেই দেশে ফিরবেন। বিচারব্যবস্থায় বিশ্বাস আছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘আমি বলেছি, এবার আমি দেশে ফিরছি। একদিন তোমরাও সবাই এসো। আমরা সবাই একসঙ্গে আদালতে আত্মসমর্পণ করব।’
দেশে ফিরলে গ্রেপ্তার বা হত্যার আশঙ্কা উড়িয়ে না দিয়ে তিনি যোগ করেন, ‘যদি মৃত্যুই আসে, আমি চাই আমার নিজের মাটিতেই মৃত্যু হোক—যেখানে আমার বাবা-মা সমাহিত আছেন।’
তবে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলোর মতে, ডিসেম্বরের এই সময়সীমাটি মূলত একটি প্রতীকী চাপ। এর উদ্দেশ্য হলো ভেঙে পড়া নেতাকর্মীদের চাঙা করা এবং দলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিতে রাজনৈতিক পরিসর তৈরি করা।
এদিকে শেখ হাসিনার এই সাক্ষাৎকার ও দেশে ফেরার বার্তা প্রচারের মধ্যেই সরকারের তথ্য অধিদফতর থেকে একটি বিশেষ তথ্যবিবরণী জারি করা হয়েছে। এতে ক্ষমতাচ্যুত ও পলাতক শেখ হাসিনার যেকোনো ধরনের বক্তব্য, সাক্ষাৎকার, ভাষণ বা বিবৃতি গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের ক্ষেত্রে আদালতের নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হয়।
তথ্য বিবরণীতে স্পষ্ট করা হয়েছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) পলাতক শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, আদালতের সাজাপ্রাপ্ত কোনো পলাতক অপরাধীর বক্তব্য সরাসরি বা ধারণকৃত কোনো মাধ্যমেই প্রচারের সুযোগ নেই। সরকারের এই তাৎক্ষণিক অবস্থান প্রমাণ করে, শেখ হাসিনার এমন বক্তব্যকে আইনি ও রাজনৈতিকভাবে কঠোরভাবে মোকাবিলা করছে অন্তর্বর্তী সরকার।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক টার্নিং পয়েন্ট। টানা সাড়ে ১৫ বছরের একক শাসনের অবসান ঘটিয়ে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। জাতিসংঘের চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই আন্দোলনে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন এবং হাজার হাজার মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করেন।
এদিকে শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার পর তার সরকারের পতন ঘটে এবং পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালসহ দেশের বিভিন্ন আদালতে তার বিরুদ্ধে শত শত মানবতাবিরোধী অপরাধ, হত্যা ও গণহত্যার মামলা দায়ের হয়। ইতোমধ্যে ট্রাইব্যুনাল ও আদালতের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গণহত্যার মামলায় তার মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ সালের ১২ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করে আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সব সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। বিএনপি সরকারে এসেও সেই নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখে। এমনকি সংসদে আইনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
শেখ হাসিনার এই বিচার ও ফাঁসির রায় দ্রুত কার্যকরের দাবিতে দেশের সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও আকাঙ্ক্ষা বিরাজ করছে। গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির এই সময়ে দেশের মানুষ এখনো জুলাইয়ের সেই নৃশংসতা ও স্বজন হারানোর বেদনা ভুলে যায়নি।
আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা ভারত, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও আরব আমিরাতে বসে বিলাসী জীবন যাপন করছেন এমন তথ্যে দেশের ভেতরে থাকা সাধারণ কর্মী ও জনগণের ক্ষোভের মাত্রা আরও বেড়েছে। দেশের বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল এবং জুলাইয়ের বিপ্লবে অংশ নেওয়া ছাত্র-জনতা শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে ফাঁসির রায় কার্যকরের প্রশ্নে সম্পূর্ণ একতাবদ্ধ।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের মুখে টানা সাড়ে ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে ভারতে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা। এরপর থেকে মাঠপর্যায়ে দলটির দৃশ্যমান কোনো সাংগঠনিক শক্তি নেই, দলের বড় একটি অংশ এখন কারাগারে আর শীর্ষ নেতারা বিভিন্ন দেশে ফেরারি। এমন ভঙ্গুর ও সম্পূর্ণ ছন্নছাড়া অবস্থায় মৃত্যুদণ্ডের পরোয়ানা মাথায় নিয়ে শেখ হাসিনার বাস্তবে দেশে ফেরার সুযোগ কতটা, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
তারা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের গ্রেফতারি পরোয়ানা ও ফাঁসির রায় বহাল থাকা অবস্থায় কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া বাংলাদেশে পা রাখামাত্রই আইনি প্রক্রিয়ায় তাকে সরাসরি কারাগারে যেতে হবে। ফলে, ডিসেম্বরে ফেরার এই ডেটলাইন কোনো বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ নয়। বরং এটি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ও চলমান সংস্কার প্রক্রিয়া থেকে মানুষের মনোযোগ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার একটি অমূলক মনস্তাত্ত্বিক চাপ।
শেখ হাসিনার এই বক্তব্যকে পুরোপুরি ‘অন্তঃসারশূন্য’ ও ‘ধোঁকাবাজি’ বলে আখ্যা দিয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সামসুল আলম। এক প্রশ্নের জবাবে এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানে পলাতক শেখ হাসিনা এখন পর্যন্ত তার অন্যায়-অত্যাচারের জন্য কোনো ক্ষমা চাননি, বরং ভারতের প্রশ্রয়ে দাম্ভিক বিবৃতি দিচ্ছেন। এই ঘোষণা হতাশ নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত রাখার একটি কৌশল মাত্র। বাস্তবতা হলো, আন্তর্জাতিক ও দেশীয় পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণ তার বিপক্ষে।’
অধ্যাপক আলম আরও অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা জনগণের লুটে নেওয়া টাকায় বিদেশে বিলাসী জীবন যাপন করছেন এবং সেখানে একাধিক বিয়েও করছেন। অথচ তাদের নির্দেশে সাধারণ কর্মীরা দেশে জেল-জুলুমের শিকার হচ্ছে। তাই সাধারণ নেতাকর্মীদের উচিত এই বিভ্রান্তিকর বক্তব্যে পা না দিয়ে নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়ে সতর্ক হওয়া।
