আমরা হয় জিতি, না হয় মরি: মরুসিংহ ওমর আল-মুখতার

এখনবাংলা: সম্রাজবাদী ইতালির শাসক বেনিতো মুসোলিনির এক সেনা অফিসার জিজ্ঞেস করেছিল: ‘তুমি কি জান তোমার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড?’ জবাবে ওমর মুখতার বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ’। ওই অফিসার বললেন, ‘তুমি যা করেছ তার জন্য তুমি কী অনুতপ্ত?’ ওমর মুখতার

বললেন, ‘প্রশ্নই হয় না, আমি আমার ধর্ম, দেশ আর মানুষের জন্য লড়েছি।’ সেনা আদালতের বিচারক তার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘তোমার মত লোকের এমন পরিণতি দেখে আমি দুঃখিত।’ ওমর মুখতার বললেন, ‘কিন্তু এটাই তো জীবন শেষ করার সর্বশ্রেষ্ঠ উপায়। মহান আল্লাহকে ধন্যবাদ তিনি আমাকে এভাবে বীরের মত শহীদ হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন।’ এরপর বিচারক প্রস্তাব দিল তাকে মুক্ত করে

দেয়া হবে যদি তিনি মুজাহিদদের কাছে চিঠি লেখেন যাতে মুজাহিদরা ইটালিয়ানদের সাথে যুদ্ধ বন্ধ করে। ওমর মুখতার বিচারকের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন: ‘যেই শাহাদত অঙ্গুলি দিয়ে আমি প্রতিদিন সাক্ষ্য দেই যে এক আল্লাহ ছাড়া আর কোন মাবুদ নাই। সেই আঙ্গুল দিয়ে অসত্য কোনো কথা লিখতে পারবো না। আমরা এক আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছে আত্মসমর্পণ করি না। আমরা হয় জিতি, না হয় মরি।’

খুব বেশিদিন নয়, ২৩ বছর ধরে ইতালিয় উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়েছিল লিবিয়ার কিংবদন্তীতুল্য সংগ্রামী নেতা ওমর আল মুখতার ও তার অনুসারী মুজাহিদরা। ১৯৩১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর দখলদার ইতালিয় সেনাদের হাতে ওমর আল মুখতার ৭২ বছর বয়সে শাহাদত বরণ করেন। বিংশ শতাব্দীতে বিশ্ব জুড়ে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে নিজ দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব

রক্ষার জন্য যে কয়জন নেতা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বীরদর্পে লড়াই করে গেছেন, তাদের মধ্যে সেনুসী আন্দোলনের নেতা ওমর আ‌ল-মুখতার অন্যতম। সমসাময়িক অন্যান্য নেতার মতো ইতালিয়ানদের প্রস্তাব করা সুযোগ সুবিধার কাছে নিজেকে বিকিয়ে না দিয়ে, ৭৩ বছর বয়স পর্যন্ত লড়াই করে অবশেষে তিনি ইতালিয়ানদের হাতে ধরা পড়েন। প্রহসনের এক বিচারের মাধ্যমে ইতালির

ফ্যাসিস্ট সরকার ১৯৩১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যদণ্ড দেয়। ওমর আল-মুখতারের জন্ম ১৮৫৮ সালে (মতান্তরে ১৮৬২ সালে), লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলের তবরুক শহরের নিকটবর্তী জাওইয়াত জাঞ্জুর নামক গ্রামে, মানফি নামক এক আরব বেদুইন গোত্রে। ওমরের বয়স যখন ১৬ বছর, তখন তারা বাবা হজ করতে গিয়ে ইন্তেকাল করেন। বাবার ইচ্ছে অনুযায়ী, এতিম ওমরের

দায়িত্ব গ্রহণ করেন স্থানীয় সেনুসি শেখ শেরিফ আল-গারিয়ানি। সে সময় লিবিয়াতে সেনুসি আন্দোলনের বেশ প্রভাব ছিল। রায় শুনে ওমর আল-মুখতার পবিত্র কুরআন শরিফ থেকে উচ্চারণ করেন, ‘নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহ্‌র জন্য, এবং তার কাছেই আমরা ফিরে যাব।’ ১৯৩১ সালের ১৬

সেপ্টেম্বর, বুধবার, বেনগাজীর নিকটবর্তী সুলুক শহরে ওমর আল-মুখতারের ফাঁসির আয়োজন করা হয়। লিবিয়ানদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার জন্য ইতালিয়ানরা প্রায় ২০,০০০ মানুষকে ফাঁসির ময়দানে উপস্থিত করে। সকাল ৯টার সময় প্রকাশ্য ময়দানে জনসমক্ষে তার ফাঁসি কার্যকর করা

হয়। শহীদ হন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম এক বীর যোদ্ধা, যিনি পরাজয় নিশ্চিত জেনেও অন্যায়ের কাছে কখনও মাথা নত করেননি। ৭৩ বছর বয়সে জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত যিনি লড়ে গেছেন দখলদার বাহিনীর হাত থেকে নিজের দেশকে মুক্ত করার জন্য।

ফেসবুকে আমরা